অষ্টমীর সকাল মানেই নতুন শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে মণ্ডপে ছুটে যাওয়া, হাতে ফুল-বেলপাতা নিয়ে মায়ের পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া। কিন্তু ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় অষ্টমীর অঞ্জলি ও সন্ধিপুজোর সময় নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ কৌতূহল।
কারণ এ বছর অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণ পড়ছে ১৯ অক্টোবর, সোমবার। আর কোন পঞ্জিকা অনুসরণ করা হচ্ছে, তার উপর সন্ধিপুজোর সময়ের মধ্যে বেশ কয়েক ঘণ্টার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
তাহলে কখন ঘুম থেকে উঠবেন? কখন মণ্ডপে পৌঁছবেন? আর কেনই বা সন্ধিপুজোর সময় ঠিক ৪৮ মিনিট?
২০২৬ সালে মহাষ্টমী কবে?
বাঙালির দুর্গাপুজোর নিরিখে মহাষ্টমী পড়ছে ১৯ অক্টোবর, সোমবার। এ বছর তিথির বিন্যাসের কারণে সপ্তমী দু’টি সূর্যোদয় ছুঁয়ে যাওয়ায় পুজোর দিনপঞ্জিতে কিছুটা বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পঞ্জিকার গণনায় অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণের সময়ও আলাদা দেখা যাচ্ছে।
তাই শুধু ঘড়ির সময় দেখে অঞ্জলি বা সন্ধিপুজোর সময় ঠিক না করে নিজের পাড়ার পুজো কমিটি কোন পঞ্জিকা অনুসরণ করছে, সেটি আগে জেনে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন সন্ধিপুজো হয় ঠিক ৪৮ মিনিট?
‘সন্ধি’ শব্দের অর্থ সংযোগ বা মিলন। দুর্গাপুজোর সন্ধিপুজো হল মহাষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিটের সংযোগস্থল।
অর্থাৎ—
২৪ মিনিট + ২৪ মিনিট = মোট ৪৮ মিনিট।
এই সময়টিকেই বলা হয় সন্ধিক্ষণ বা সন্ধিকাল। প্রচলিত শাক্ত বিশ্বাসে এই সময় দেবী দুর্গার চামুণ্ডা রূপের আরাধনা করা হয়। ১০৮টি প্রদীপ এবং ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের রীতিও বহু দুর্গাপুজোয় দেখা যায়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—সন্ধিপুজো নামের মধ্যে ‘সন্ধ্যা’ শব্দের মতো শোনালেও এটি অবশ্যই সন্ধ্যার সময় হতে হবে, এমন নয়। এটি দিন-রাতের সন্ধি নয়, বরং দুই তিথির সন্ধিক্ষণ। ফলে কোনও বছর এটি ভোরে, কোনও বছর সকালে, আবার অন্য সময়ে দিনের অন্য প্রহরেও পড়তে পারে।
তাহলে ২০২৬-এ সন্ধিপুজো কখন?
এখানেই রয়েছে এবারের সবচেয়ে বড় চমক।
গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুযায়ী
গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর সকাল ৭টা ২৫ মিনিট ১৫ সেকেন্ড থেকে ৮টা ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড পর্যন্ত সন্ধিপুজোর সময়।
অষ্টমী তিথি শেষ হচ্ছে সকাল ৭টা ৪৯ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে। অর্থাৎ ৭টা ২৫ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে সন্ধিপুজো শুরু হয়ে অষ্টমী-নবমীর মূল সন্ধিক্ষণ পার করে ৮টা ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে শেষ হবে।
এই পঞ্জিকা অনুসরণকারী মণ্ডপে তাই অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি ও অন্যান্য আচার খুব সকালেই সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকতে পারে।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী
অন্যদিকে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী সময় অনেকটাই পরে।
১৯ অক্টোবর সকাল ১০টা ২৮ মিনিট থেকে ১১টা ১৬ মিনিট—এই ৪৮ মিনিটকে সন্ধিপুজোর সময় ধরা হচ্ছে।
বেলুড় মঠের ২০২৬ সালের সরকারি দুর্গাপুজোর সূচিতেও এই সময়ই দেওয়া হয়েছে। মঠ জানিয়েছে, তাদের পুজো বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে হবে।
অর্থাৎ একই দিনে সন্ধিপুজোর জন্য দুই ধরনের সময় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে—
| পঞ্জিকা/পরম্পরা | সন্ধিপুজোর সময় |
|---|---|
| গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা | সকাল ৭:২৫:১৫ – ৮:১৩:১৫ |
| বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত | সকাল ১০:২৮ – ১১:১৬ |
| বেলুড় মঠ | সকাল ১০:২৮ – ১১:১৬ |
এই পার্থক্যকে সরাসরি ‘একটি ভুল’ বলে দেখার চেয়ে ভিন্ন পঞ্জিকা-পদ্ধতির গণনাগত পার্থক্য হিসেবে দেখা বেশি সঙ্গত।
অষ্টমীর অঞ্জলি কখন দেবেন?
অষ্টমীর অঞ্জলির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সর্বজনীন সময় সব মণ্ডপের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ পুজোর আচার, পঞ্জিকা এবং স্থানীয় পুরোহিতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সময়সূচি বদলাতে পারে।
তাই আপনি যদি কোনও নির্দিষ্ট পাড়ার পুজোয় অঞ্জলি দিতে চান, সেই মণ্ডপের প্রকাশিত সময়সূচিই অনুসরণ করুন।
বিশেষ করে গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসরণকারী পুজোয় যদি অষ্টমীর মূল আচার সকালেই শেষ করার সময় থাকে, তাহলে দেরি করে মণ্ডপে পৌঁছনো ঠিক হবে না। আবার বেলুড় মঠের মতো বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুসরণকারী জায়গায় সকালবেলার অনুষ্ঠানসূচি আলাদা। বেলুড় মঠের ক্ষেত্রে মহাষ্টমীর পুজো শুরু হচ্ছে ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে, কুমারী পুজো সকাল ৯টায় এবং সন্ধিপুজো ১০টা ২৮ মিনিটে।
কখন শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে রেডি হবেন?
যাঁরা অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে চান, তাঁদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পরিকল্পনা হল সকালের অনুষ্ঠান ধরে প্রস্তুত হওয়া।
অর্থাৎ আগের রাতেই পোশাক, ফুল-বেলপাতা, পুজোর প্রয়োজনীয় জিনিস এবং যাতায়াতের পরিকল্পনা করে রাখুন। কারণ কোন মণ্ডপে কখন অঞ্জলি হবে, তা নিয়ে শেষ মুহূর্তে ভিড়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া সমস্যার হতে পারে।
আর সন্ধিপুজো দেখতে চাইলে অবশ্যই মণ্ডপের নিজস্ব নির্ঘণ্ট আগে দেখে নিন।
কেন প্রতি বছর সন্ধিপুজোর সময় বদলে যায়?
এর মূল কারণ তিথি।
তিথি সাধারণ ক্যালেন্ডারের ২৪ ঘণ্টার দিন নয়। সূর্য ও চাঁদের পারস্পরিক কৌণিক অবস্থানের ভিত্তিতে তিথি নির্ধারিত হয়। ফলে কোনও তিথি কখন শুরু বা শেষ হবে, সেটি বছরভেদে বদলায়।
আর সন্ধিপুজো যেহেতু অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিটের উপর নির্ভর করে, তাই অষ্টমী তিথি কখন শেষ হচ্ছে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সেই কারণেই সন্ধিপুজোকে কোনও নির্দিষ্ট ঘড়ির সময়ের সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে বেঁধে দেওয়া যায় না।
১০৮টি প্রদীপ ও ১০৮টি পদ্ম কেন?
সন্ধিপুজোর সঙ্গে ১০৮ সংখ্যাটির বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। প্রচলিত আচার অনুযায়ী এই সময় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো এবং ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের রীতি রয়েছে।
তবে প্রতিটি পুজোমণ্ডপে একইভাবে এই আচার পালন করা হবে—এমন নয়। বনেদি বাড়ির পুজো, বারোয়ারি পুজো কিংবা মঠের নিজস্ব রীতিতে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
তাহলে এবার কী করবেন?
২০২৬ সালের অষ্টমীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—নিজের পুজোর পঞ্জিকা জেনে নিন।
কারণ একই ১৯ অক্টোবরের জন্য এক জায়গায় সকাল ৭টা ২৫ মিনিট থেকে ৮টা ১৩ মিনিট, আবার অন্য পরম্পরায় সকাল ১০টা ২৮ মিনিট থেকে ১১টা ১৬ মিনিট পর্যন্ত সন্ধিপুজোর সময় দেখা যাচ্ছে।
তাই অঞ্জলি দিতে যাওয়ার আগে পুজো কমিটি বা পুরোহিতের কাছ থেকে সময় নিশ্চিত করুন। আর সন্ধিপুজোর ক্ষেত্রে শুধু ‘সন্ধ্যা হবে’ ভেবে অপেক্ষা করবেন না—২০২৬ সালে অন্তত কিছু পঞ্জিকা অনুযায়ী এই মহাসন্ধিক্ষণ পড়ছে সকালেই।
FACT CHECK
২০২৬ সালের মহাষ্টমী: ১৯ অক্টোবর, সোমবার।
সন্ধিপুজোর নিয়ম: অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট + নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট = ৪৮ মিনিট।
গুপ্তপ্রেস: সকাল ৭:২৫:১৫–৮:১৩:১৫।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত/বেলুড় মঠ: সকাল ১০:২৮–১১:১৬।
অতএব, ‘এবার পুজোর সময় বদলে গেছে’—এর চেয়ে বলা ভালো, ২০২৬ সালের তিথি ও পঞ্জিকা-গণনার কারণে সন্ধিপুজোর সময় নিয়ে আলাদা নির্ঘণ্ট দেখা যাচ্ছে।



