আজ মুম্বইয়ের অ্যান্টিলিয়া মানেই চোখ ধাঁধানো বিলাসিতা। ২৭ তলা এই ব্যক্তিগত আবাসন শুধু মুকেশ আম্বানির বাড়ি নয়, বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিগত বাড়িও বটে। কিন্তু এই বিশাল বাড়ির আগে আম্বানি পরিবারের ঠিকানা কেমন ছিল?
যে পরিবারকে আজ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে দেখা হয়, তাদের পথচলার শুরুর গল্প কিন্তু এতটা বিলাসবহুল ছিল না। মুম্বইয়ের ভূলেশ্বরের একটি দুই কামরার অ্যাপার্টমেন্ট থেকেই শুরু হয়েছিল সেই পারিবারিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভূলেশ্বরের দুই কামরার বাড়ি থেকেই শুরু
ধীরুভাই আম্বানি ইয়েমেন থেকে ভারতে ফিরে এসে ব্যবসা শুরু করার পর মুম্বইয়ে পরিবারের সঙ্গে ভূলেশ্বরের Jai Hind Estate-এর একটি দুই কামরার ফ্ল্যাটে থাকতেন বলে বিভিন্ন জীবনী ও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সেই সময় Reliance-এর আজকের মতো বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি হয়নি। ধীরুভাইয়ের ব্যবসার পরিধিও ছিল অনেক ছোট। এমনকি তাঁর ব্যবসার প্রথম দিকের অফিসও ছিল অত্যন্ত ছোট—Masjid Bunder-এর Narsinatha Street-এ প্রায় ৩৫০ বর্গফুটের একটি ঘর।
অর্থাৎ আজকের অ্যান্টিলিয়ার সঙ্গে সেই সময়কার আম্বানি পরিবারের জীবনযাত্রার তুলনা করলে ব্যবধানটা সহজেই বোঝা যায়।
ব্যবসা বাড়ল, বদলাতে শুরু করল ঠিকানাও
Reliance-এর ব্যবসা ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আম্বানি পরিবারের জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন আসে।
ভূলেশ্বরের পর পরিবারটি Carmichael Road-এর Usha Kiran Society-তে গিয়েছিল বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এরপর তাদের ঠিকানা হয় দক্ষিণ মুম্বইয়ের Sea Wind, Cuffe Parade।
তবে এই বাসস্থান বদলের সময়কাল নিয়ে সব সূত্রে একরকম তথ্য নেই। তাই কোন বাড়িতে ঠিক কত বছর ছিলেন—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা বলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
Sea Wind ছিল আম্বানি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা
Antilia আসার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানাগুলির একটি ছিল Sea Wind।
এখানেই দীর্ঘ সময় ধরে মুকেশ ও অনিল আম্বানি তাঁদের পরিবার নিয়ে থাকতেন। মা কোকিলাবেন আম্বানিও এই পরিবারের সঙ্গে একই আবাসনে ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে Sea Wind-কে এমন একটি পারিবারিক ঠিকানা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে পরিবারের বিভিন্ন সদস্য আলাদা জায়গায় থাকলেও একই বিল্ডিংয়ের মধ্যে তাঁদের পারিবারিক যোগাযোগ বজায় ছিল।
Sea Wind-এর ফ্লোর সংখ্যা নিয়েও সংবাদমাধ্যমে ১৪, ১৭ বা ১৯ তলার মতো ভিন্ন তথ্য দেখা যায়। তাই এটিকে শুধু একটি নির্দিষ্ট তলা সংখ্যায় বর্ণনা না করাই নিরাপদ।
দুই ভাইয়ের ব্যবসায়িক বিভাজনের সময়ও ছিল Sea Wind
ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যুর পর Reliance সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুকেশ ও অনিল আম্বানির মধ্যে দীর্ঘ ব্যবসায়িক বিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত দুই ভাইয়ের ব্যবসায়িক ক্ষেত্র আলাদা হয়ে যায়।
কিন্তু মজার বিষয় হল, তাঁদের পারিবারিক বাসস্থান হিসেবে Sea Wind-এর গুরুত্ব একেবারে তখনই শেষ হয়ে যায়নি। পুরনো প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই ভাইয়ের পরিবার একই আবাসনে থেকেছে এমন সময়ও ছিল।
অর্থাৎ Sea Wind শুধু একটি বাড়ি ছিল না—আম্বানি পরিবারের ব্যবসা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং পরবর্তী পরিবর্তনের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে এই ঠিকানাটি জড়িয়ে রয়েছে।
তারপর এল Antilia
এরপর মুম্বইয়ের Altamount Road-এ তৈরি হল সেই বাড়ি, যার নাম আজ প্রায় সারা বিশ্বে পরিচিত—Antilia।
২০১০ সালে নির্মাণ শেষ হওয়া এই ২৭ তলা ব্যক্তিগত skyscraper-এর নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিল Perkins & Will। Guinness World Records-এর তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির মোট living floor area প্রায় ৪ লক্ষ বর্গফুট, রয়েছে ১৬৮টি গাড়ি রাখার জায়গা এবং তিনটি helipad।
বাড়িটির উচ্চতা প্রায় ১৭৩ মিটার। মজার বিষয় হল, ২৭ তলা হলেও প্রতিটি তলার ceiling height অনেক বেশি হওয়ায় এর উচ্চতা সাধারণত প্রায় ৬০ তলা একটি অফিস ভবনের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
Antilia-তে কী কী রয়েছে?
Antilia-কে সাধারণ অর্থে শুধু ‘বাড়ি’ বলা কঠিন।
Guinness World Records-এর তথ্য অনুযায়ী, এখানে রয়েছে একাধিক swimming pool, health spa, theatre, বিশাল parking facility এবং তিনটি helipad। পুরো ভবনটিতে বিপুল সংখ্যক কর্মীও কাজ করেন।
বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে এর সঙ্গে ballroom, cinema theatre, gym, ice room এবং একাধিক বিনোদনমূলক ও পারিবারিক সুবিধার কথাও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ একটি পরিবারের থাকার জায়গার পাশাপাশি Antilia-কে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে বিনোদন, অতিথি আপ্যায়ন, স্বাস্থ্যচর্চা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন—সবকিছুর ব্যবস্থাই একই ভবনের মধ্যে থাকে।
২৭ তলাতেই কি থাকেন মুকেশ আম্বানি?
মুকেশ আম্বানির পরিবারের ব্যক্তিগত থাকার জায়গা নিয়ে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও, ঠিক কোন তলায় পরিবারের কোন সদস্য থাকেন—এই ধরনের বিস্তারিত তথ্যকে নিশ্চিত সরকারি তথ্য হিসেবে ধরা যায় না।
তাই “মুকেশ আম্বানি শুধু ২৭ নম্বর তলাতেই থাকেন” বা নির্দিষ্ট তলায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এ ধরনের দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না।
তবে Antilia যে অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও নিরাপত্তা-নির্ভর আবাসন, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ভবনটির নকশা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গোপনীয়তা বরাবরই সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের বিষয় হয়ে এসেছে।
Antilia-র দাম কত?
Antilia-র মূল্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বহু বছর ধরে বিভিন্ন অঙ্ক প্রকাশিত হয়েছে। ₹১৫,০০০ কোটি বা তার বেশি মূল্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—Antilia-র প্রকৃত নির্মাণব্যয় বা বর্তমান বাজারমূল্য নিয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য সর্বজনীন সরকারি মূল্যায়ন নেই।
Guinness World Records নির্মাণমূল্য সম্পর্কে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার-এর অনুমান উল্লেখ করেছে, একই সঙ্গে তারা বলেছে প্রকৃত expenditure স্পষ্ট নয়।
তাই ₹১৫,০০০ কোটি-কে নিশ্চিত বর্তমান বাজারমূল্য না বলে মিডিয়া-রিপোর্টে প্রচলিত আনুমানিক মূল্য হিসেবে উল্লেখ করাই বেশি নির্ভুল।
দুই কামরার ফ্ল্যাট থেকে Antilia—কেন এই গল্প এত গুরুত্বপূর্ণ?
আম্বানি পরিবারের বাসস্থানের ইতিহাস আসলে শুধু বাড়ি বদলের গল্প নয়।
ভূলেশ্বরের দুই কামরার ফ্ল্যাট, Usha Kiran Society, Sea Wind—প্রতিটি ঠিকানা ধীরুভাই ও তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক উত্থানের আলাদা পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।
আর সেই যাত্রার পরিণতিতে মুম্বইয়ের আকাশরেখায় তৈরি হয়েছে Antilia—একটি ২৭ তলা ব্যক্তিগত আবাসন, যার আকার ও সুবিধা সাধারণ বিলাসবহুল বাড়ির ধারণাকেও অনেকটাই বদলে দিয়েছে।
FACT CHECK
- ধীরুভাই আম্বানির পরিবার মুম্বইয়ের ভূলেশ্বরের Jai Hind Estate-এর দুই কামরার ফ্ল্যাটে থাকত—এ তথ্য একাধিক জীবনী ও প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।
- পরে Usha Kiran Society এবং Sea Wind-এর মতো ঠিকানার সঙ্গে আম্বানি পরিবারের বসবাসের ইতিহাস যুক্ত হয়েছে।
- Antilia একটি ২৭ তলা ব্যক্তিগত আবাসন এবং Guinness World Records অনুযায়ী এর living area প্রায় ৪ লক্ষ বর্গফুট।
- ১৬৮টি parking space এবং তিনটি helipad-এর তথ্য Guinness World Records-এ রয়েছে।
- Antilia-র ₹১৫,০০০ কোটি মূল্যটি নিশ্চিত সরকারি valuation নয়; বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে প্রচলিত আনুমানিক অঙ্ক।



