একসময় বাংলা ছবির পর্দায় জনপ্রিয় মুখ ছিলেন জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। অপরূপা, মিলন তিথি, নাগমতী, হীরক জয়ন্তী—একাধিক ছবিতে অভিনয় করে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি অধ্যায় আজও কৌতূহল জাগায়। অভিনেত্রী চুমকি চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল, বিয়ের কথাও এগিয়েছিল। তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত কেন একসঙ্গে পথ চলেননি তাঁরা?
জীবনের শেষ দিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয় নিজেই তাঁদের সম্পর্কের কথা বলেছিলেন। সেই স্মৃতিচারণে উঠে এসেছিল প্রেম, সম্পর্কের আকস্মিক পরিণতি এবং পেশাগত জীবনে তার প্রভাব নিয়ে তাঁর আক্ষেপ। তবে এই বিচ্ছেদের পিছনে অহংকার বা অন্য কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নিশ্চিত তথ্য নেই।
অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে কাজ করতে গিয়েই প্রেম
জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ও চুমকি চৌধুরীর পরিচয় হয়েছিল বাংলা ছবির জগতে কাজ করার সূত্রে। পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর হীরক জয়ন্তী ও অভাগিনী ছবির সঙ্গে তাঁদের নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সেই সময় দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং সম্পর্ক প্রেমের দিকে এগোয়।
জয় পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, চুমকির সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং বিয়ের কথাও চলছিল। দুই পরিবারের মধ্যেও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। ফলে সম্পর্কটি বিয়ে পর্যন্ত গড়াতে পারে, এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
বিয়ের কথা এগিয়েও কেন আলাদা হয়ে গেলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জয় নিজেই বলেছিলেন, তাঁদের সম্পর্ক আচমকাই ভেঙে যায়। আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, আলাদা হয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ তাঁর স্মৃতিচারণে স্পষ্ট ছিল না। তবে পরে এই সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি কেরিয়ারকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গও তুলেছিলেন।
তাই চুমকিকে বিয়ে না করার ঘটনাকে শুধু অহংকারের ফল বলা ঠিক হবে না। জয়ের বক্তব্য থেকে বরং বোঝা যায়, সম্পর্কের পরিণতি নিয়ে তাঁর নিজেরও কিছু আক্ষেপ ছিল। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পেশাগত জীবনের সিদ্ধান্ত কীভাবে পরস্পরের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, সেই উপলব্ধিই তাঁর পরবর্তী মন্তব্যে উঠে এসেছিল।
অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে আর কাজ করা হয়নি কেন?
জয় তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর চুমকির সঙ্গে আর জুটি বেঁধে অভিনয় করা হয়নি। অঞ্জন চৌধুরীর আরও ছবিতে কাজ করার সুযোগ থাকলে তাঁর পেশাগত জীবন অন্য রকম হতে পারত—এমন আক্ষেপও করেছিলেন তিনি।
তবে ঠিক দশটি সুপারহিট ছবির কাজ তিনি হারিয়েছিলেন, এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করার মতো তথ্য নেই। বরং বলা যায়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিণতি এবং পেশাগত যোগাযোগের দূরত্ব নিয়ে জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে ফিরে তাকিয়েছিলেন অভিনেতা।
অপরূপা থেকে জনপ্রিয় নায়ক: জয়ের অভিনয়জীবন
জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল অপরূপা ছবির মাধ্যমে। আশির দশক থেকে বাংলা ছবিতে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। মিলন তিথি, নাগমতী, জীবন মরণ, হীরক জয়ন্তী এবং চপার-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন।
তাঁর অভিনয়জীবনের উত্থান এক সময় তাঁকে জনপ্রিয় নায়কদের সারিতে নিয়ে এসেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে বদল এসেছে, বদলেছে কাজের ধরনও। জয়ের অভিনয়জীবনও সেই পরিবর্তনের বাইরে ছিল না।
অভিনয় থেকে রাজনীতি: কেন বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন?
২০১৪ সালে জয় বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিতে যোগ দেন এবং সেই বছর বীরভূম লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরপর ২০১৯ সালে উলুবেড়িয়া লোকসভা কেন্দ্র থেকেও বিজেপির প্রার্থী হন। দুটি নির্বাচনেই তিনি জয়ী হতে পারেননি। ২০২১ সালে তিনি জানান, আর নির্বাচনে বিজেপির প্রতিনিধিত্ব করবেন না।
তবে রাজনীতিতে যাওয়ার পিছনে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নিয়ে অনুমান না করে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা ভালো। অভিনয় থেকে রাজনীতিতে যাওয়া তাঁর জীবনের একটি বড় মোড় ছিল।
ব্যক্তিগত জীবন ও অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই
জয়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা সময়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সব দিক সম্পর্কে প্রকাশ্যে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
জীবনের শেষ কয়েক বছরে শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাঁকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২৫ আগস্ট ২০২৫ সালে ৬২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
জীবনের শেষে ফিরে দেখা প্রেমের সেই অধ্যায়
জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ছিল অভিনয়, জনপ্রিয়তা, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের নানা বাঁকে ভরা। চুমকি চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও সেই জীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁদের বিয়ে হয়নি কেন, তার একটিমাত্র নিশ্চিত ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যায় না। কিন্তু জয়ের নিজের বক্তব্যে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া এবং পেশাগত জীবনে তার প্রভাব নিয়ে আক্ষেপের কথা স্পষ্ট হয়েছিল।
সেই কারণেই এই গল্পকে শুধু ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি হিসেবে দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বরং এটি এমন এক অভিনেতার স্মৃতিচারণ, যিনি জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে ফিরে তাকিয়ে বুঝেছিলেন—ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও পেশাগত সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।



