আশির দশকের শেষ দিক। তখনও বাংলার ঘরে ঘরে সাদা-কালো টেলিভিশনের স্মৃতি বেশ টাটকা, আর বিনোদনের জগতে দূরদর্শনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ঠিক সেই সময়েই বাংলা টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল এক অপ্রত্যাশিত জুটি—অভিনেত্রী মুনমুন সেন এবং রাজনীতিবিদ সুব্রত মুখোপাধ্যায়।
ধারাবাহিকটির নাম ছিল ‘চৌধুরী ফার্মাসিউটিক্যালস’। রাজনীতির ময়দানে পরিচিত সুব্রত মুখোপাধ্যায় সেখানে অভিনয় করেছিলেন নায়কের ভূমিকায়, আর তাঁর বিপরীতে ছিলেন সুচিত্রা সেনের মেয়ে মুনমুন সেন। তাঁদের একসঙ্গে অভিনয়, বিশেষ করে সুইমিং পুলের একটি দৃশ্য, সে সময় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
কিন্তু কীভাবে রাজনীতির পরিচিত মুখ ছোটপর্দার নায়ক হয়ে উঠলেন? কেনই বা মাত্র ১৪টি পর্বের পর বন্ধ হয়ে যায় ধারাবাহিকটি? এই গল্পের পিছনে রয়েছে বাংলা টেলিভিশনের এক বিস্মৃত অধ্যায়।
১৯৮৮ সালে শুরু ‘চৌধুরী ফার্মাসিউটিক্যালস’-এর কাজ
পরিচালক অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে ধারাবাহিকটির কাজ শুরু হয়েছিল। তখন সুব্রত মুখোপাধ্যায় রাজনীতির জগতে পরিচিত মুখ। ক্যামেরার সামনে অভিনয় করা তাঁর কাছে ছিল একেবারেই অন্য অভিজ্ঞতা।
অগ্নিদেবের স্মৃতিতে, রাজনীতির ময়দানে আত্মবিশ্বাসী সুব্রত মুখোপাধ্যায় শুটিংয়ের সময় বেশ নার্ভাস ছিলেন। পরিচালকের নির্দেশ মেনে অভিনয় করার চেষ্টা করতেন তিনি। সেই ধারাবাহিকের নায়িকা ছিলেন মুনমুন সেন, যিনি তখন বাংলা ও হিন্দি সিনেমার পরিচিত অভিনেত্রী।
সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের এই অভিনয়যাত্রা ছিল তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একটি অন্য দিক। পরবর্তীকালে মুনমুন সেনও স্মরণ করেছিলেন, সুব্রতর ছোটপর্দায় অভিনয়ের কথা অনেকেই জানতেন না।
সুইমিং পুলের দৃশ্য ঘিরে কেন এত আলোচনা?
‘চৌধুরী ফার্মাসিউটিক্যালস’-এর সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলির মধ্যে ছিল মুনমুন সেন ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সুইমিং পুলের একটি দৃশ্য। সে সময়ের টেলিভিশনের প্রচলিত রীতির তুলনায় দৃশ্যটি অনেকের কাছে সাহসী মনে হয়েছিল। ফলে ধারাবাহিকটি নিয়ে দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের একাংশে আলোচনা তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দৃশ্যটি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল এবং ধারাবাহিকটির সম্প্রচার ১৪টি পর্বের পর বন্ধ হয়ে যায়। তবে শুধু ওই দৃশ্যের কারণেই ধারাবাহিকটি বন্ধ হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নিশ্চিত তথ্য নেই।
তৎকালীন দূরদর্শনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাওয়া যায়। Hindustan Times-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুমোদিত চিত্রনাট্য থেকে সরে যাওয়ার অভিযোগের পর ধারাবাহিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে ঘটনাটিকে শুধুমাত্র একটি দৃশ্যকে ঘিরে তৈরি বিতর্কের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা অসম্পূর্ণ হবে।
পর্দার রোম্যান্স কি বাস্তব জীবনের সম্পর্কের ইঙ্গিত ছিল?
মুনমুন সেন ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের অনস্ক্রিন জুটি দর্শকের কৌতূহল বাড়িয়েছিল ঠিকই। কিন্তু পর্দায় রোম্যান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করার অর্থ বাস্তব জীবনেও তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল, এমন নয়।
মুনমুন সেন পরে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর এক স্মৃতিচারণে তাঁদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্কের কথা লিখেছিলেন। তিনি জানান, তাঁর ও তাঁর স্বামী রানার সঙ্গে সুব্রতর বহু বছরের যোগাযোগ ছিল। রাজনীতিতেও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছিলেন।
তাই তাঁদের সম্পর্ককে বোঝার ক্ষেত্রে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব ও রাজনৈতিক যোগাযোগের তথ্যই বেশি নির্ভরযোগ্য। ব্যক্তিগত প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে কোনও নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া জল্পনাকে সত্যি হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয়।
মুনমুন সেনের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল সুব্রতর নাম
মুনমুন সেন শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই নয়, পরবর্তী সময়ে রাজনীতিবিদ হিসেবেও পরিচিতি পান। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে বাঁকুড়া কেন্দ্র থেকে জয়ী হন।
সুব্রত মুখোপাধ্যায়ও তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর মুনমুন সেনের স্মৃতিচারণে সেই সম্পর্কের আবেগ স্পষ্ট হয়েছিল।
আজও কেন মনে পড়ে ‘চৌধুরী ফার্মাসিউটিক্যালস’?
বর্তমান সময়ে বাংলা টেলিভিশনে অসংখ্য ধারাবাহিক তৈরি হয়। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে দূরদর্শনের পর্দায় একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদকে নায়কের ভূমিকায় দেখা ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। তার সঙ্গে ছিলেন মুনমুন সেনের মতো পরিচিত অভিনেত্রী। এই অপ্রত্যাশিত জুটিই ধারাবাহিকটিকে পরবর্তী সময়েও আলোচনায় রেখেছে।
‘চৌধুরী ফার্মাসিউটিক্যালস’-এর সম্প্রচার কেন বন্ধ হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন দিক উঠে এসেছে। তবে এটুকু স্পষ্ট, ধারাবাহিকটি বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায়, যেখানে রাজনীতি, অভিনয় এবং তৎকালীন সামাজিক রুচি একসঙ্গে এসে মিশেছিল।
আজও মুনমুন সেন ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সেই অভিনয়ের কথা উঠলে আশির দশকের টেলিভিশন-দর্শকদের কাছে ফিরে আসে এক অন্য সময়ের স্মৃতি।



