বাংলার ঘরে ঘরে শ্রাবণ মাসে দেবী মনসার পুজো হয়। সাপের ভয় থেকে রক্ষা, পরিবারের মঙ্গল এবং বিপদ থেকে মুক্তির আশায় বহু মানুষ এই দেবীর আরাধনা করেন। কিন্তু যাঁকে ঘিরে এত ভক্তি, তাঁর পৌরাণিক কাহিনিতে রয়েছে জন্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব, অবহেলা, অপমান এবং নিজের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ লড়াই।
কেউ বলেন, দেবী মনসা ঋষি কশ্যপের মানসকন্যা। আবার বাংলার জনপ্রিয় মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনিতে তিনি মহাদেব শিবের কন্যা। কেন তাঁকে নিজের পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল? কীভাবেই বা তাঁর একটি চোখ নষ্ট হয়েছিল? আর চাঁদ সদাগর কেন এই দেবীর পুজো করতে অস্বীকার করেছিলেন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর লুকিয়ে রয়েছে পুরাণ ও মধ্যযুগীয় বাংলা মঙ্গলকাব্যের নানা আখ্যানে। তবে মনে রাখা দরকার, বিভিন্ন গ্রন্থে কাহিনির বিবরণ এক নয়।
দেবী মনসার জন্ম কীভাবে হয়েছিল?
দেবী মনসার জন্ম নিয়ে প্রধানত দুটি কাহিনি প্রচলিত।
প্রথম কাহিনি: ঋষি কশ্যপের মানসকন্যা
পুরাণভিত্তিক একটি মত অনুসারে, ঋষি কশ্যপের মানসিক শক্তি বা ধ্যান থেকে দেবী মনসার আবির্ভাব। ‘মনসা’ নামটিকেও অনেকে ‘মন’ বা মানসিক সৃষ্টির ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেন। এই কাহিনিতে সর্পদংশনের বিষ ও সাপের বিপদ থেকে জীবজগতকে রক্ষা করার সঙ্গে দেবীর ভূমিকা জড়িয়ে রয়েছে।
কিছু পুরাণভিত্তিক বর্ণনায় কদ্রুকেও তাঁর মাতৃপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, এই ধারায় মনসার জন্মপরিচয় বাংলার শিবকন্যা-সংক্রান্ত কাহিনির থেকে আলাদা।
দ্বিতীয় কাহিনি: মহাদেব শিবের কন্যা
বাংলার মনসামঙ্গল কাব্যের বিভিন্ন সংস্করণে মনসাকে শিবের কন্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মনসাবিজয়-এর একটি জনপ্রিয় আখ্যানে, বাসুকির মাতা এক কন্যার মূর্তি নির্মাণ করেন। সেই মূর্তির সঙ্গে শিবের সংযোগ থেকেই মনসার জন্ম হয় বলে কাহিনিতে বর্ণিত।
এরপর সর্পরাজ বাসুকি তাঁকে নিজের বোন হিসেবে গ্রহণ করেন। এই আখ্যানেই মনসার জন্ম, পরিচয় এবং শিবের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে নানা নাটকীয় ঘটনা উঠে এসেছে।
কেন দেবী মনসার একটি চোখ নষ্ট হয়েছিল?
বাংলার লোকপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনির সবচেয়ে নাটকীয় অংশগুলির একটি হল মনসার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা।
মনসাবিজয়-এর প্রচলিত আখ্যান অনুযায়ী, মনসা যখন শিবের কাছে নিজের পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন, তখন শিব তাঁকে কৈলাসে নিয়ে যান। কিন্তু শিবের স্ত্রী চণ্ডী বা পার্বতী মনসাকে দেখে সন্দেহ করেন। তাঁকে শিবের উপপত্নী ভেবে ভুল করেন তিনি।
এরপর ক্রোধের বশে চণ্ডী মনসার একটি চোখে আঘাত করেন। কাব্যের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই আঘাতেই দেবীর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়।
এই ঘটনা মনসার জীবনের অপমান ও প্রত্যাখ্যানের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এটি পৌরাণিক কাহিনি—ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত কোনও ঘটনা নয়। বিভিন্ন আঞ্চলিক বর্ণনায় ঘটনার বিবরণেও পার্থক্য রয়েছে।
দেবী হয়েও কেন স্বীকৃতির জন্য লড়তে হয়েছিল মনসাকে?
মনসার কাহিনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেবী হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বাংলার মঙ্গলকাব্যে তাঁকে এমন এক দেবী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যাঁর শক্তি রয়েছে, কিন্তু যাঁর পূজা সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে বাধার মুখে পড়ে।
গবেষকদের মতে, বাংলায় মনসা-উপাসনার বিকাশের সঙ্গে প্রাচীন সর্পবিশ্বাস ও আঞ্চলিক লোকধর্মের যোগ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উপাসনা বৃহত্তর হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। মনসামঙ্গল কাব্যগুলি সেই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে কাহিনির আকারে তুলে ধরেছে।
তাই মনসার স্বীকৃতি পাওয়ার সংগ্রামকে শুধু পারিবারিক বিরোধ হিসেবে দেখলে তার সামাজিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এই কাহিনির মধ্যে রয়েছে একটি আঞ্চলিক দেবীর উপাসনা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসও।
চাঁদ সদাগর কেন মনসার পুজো করতে চাননি?
দেবী মনসার কাহিনির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে চাঁদ সদাগরের নাম। মনসামঙ্গল কাব্যের বিভিন্ন সংস্করণে চাঁদ সদাগর একজন ধনী বণিক এবং শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। মনসা তাঁর পুজো চান, কিন্তু চাঁদ সদাগর দেবীকে পূজা করতে অস্বীকার করেন।
এই প্রত্যাখ্যান থেকেই কাহিনিতে সংঘাতের সূত্রপাত। মনসা তাঁর শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান, আর চাঁদ সদাগর নিজের বিশ্বাসে অটল থাকেন। পরবর্তী ঘটনায় চাঁদ সদাগরের পরিবার ও বাণিজ্যজীবনে নেমে আসে একের পর এক বিপর্যয়।
কাহিনির এই অংশে মনসাকে একই সঙ্গে রক্ষাকারী এবং ক্রুদ্ধ দেবী হিসেবে দেখা যায়। তাঁর পুজো না করলে বিপদ আসতে পারে—এমন বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সাপের ভয় ও মানুষের নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পেয়েছে।
বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিতে কীভাবে প্রতিষ্ঠা পেল মনসা পুজো?
চাঁদ সদাগরের কাহিনির সবচেয়ে আবেগঘন অংশ বেহুলা ও লখিন্দরের উপাখ্যান। মনসার অভিশাপ বা ক্রোধের ফলে লখিন্দরের মৃত্যু হয় বলে কাব্যে বর্ণিত। কিন্তু বেহুলা স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। তাঁর ধৈর্য, ভালোবাসা এবং দেবতাদের কাছে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে কাহিনি নতুন মোড় নেয়।
বেহুলার প্রচেষ্টায় লখিন্দরের জীবন ফিরে পাওয়ার কাহিনি এবং চাঁদ সদাগরের শেষ পর্যন্ত মনসার পুজোয় সম্মতি দেওয়ার ঘটনা মনসামঙ্গলের কেন্দ্রীয় অংশ।
প্রচলিত আখ্যানে চাঁদ সদাগর শেষ পর্যন্ত বাম হাতে, মুখ ফিরিয়ে দেবীকে ফুল দেন। এই ঘটনাকে মনসার স্বীকৃতি লাভের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে চাঁদ সদাগরের এই কাহিনি ধর্মীয় ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশ; একে যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ধরা যায় না।
কেন আজও বাংলায় দেবী মনসার পুজো এত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্ষাকালে সাপের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় বাংলার গ্রামীণ জীবনে সর্পদংশনের ভয় ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেবী মনসা সেই বিপদ থেকে রক্ষা করার দেবী হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তাঁকে বিষহরী নামেও ডাকা হয়।
মনসার উপাসনা শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়। মনসামঙ্গল কাব্য, পটচিত্র, লোকসংগীত, পালাগান এবং গ্রামীণ উৎসবের মধ্য দিয়ে তাঁর কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলার সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে এই দেবীর অবস্থান তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
দেবী মনসার কাহিনি আমাদের দেখায়, কীভাবে মানুষের প্রকৃতিভীতি, বিশ্বাস, সামাজিক পরিবর্তন এবং সাহিত্য একে অপরের সঙ্গে মিশে একটি শক্তিশালী ধর্মীয় ঐতিহ্য গড়ে তুলতে পারে।
মনসার কাহিনির আসল তাৎপর্য কী?
দেবী মনসাকে শুধু রাগী বা অভিশাপদাত্রী দেবী হিসেবে দেখলে তাঁর কাহিনির সম্পূর্ণ অর্থ বোঝা যায় না। একদিকে তিনি সাপের বিপদ থেকে রক্ষাকারী, অন্যদিকে তাঁর কাহিনিতে রয়েছে প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
তাঁর জন্ম নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত, শিবের পরিবারের সঙ্গে সংঘাত, এক চোখ নষ্ট হওয়ার কাহিনি এবং চাঁদ সদাগরের কাছ থেকে পূজা আদায়—সব মিলিয়ে মনসার উপাখ্যান বাংলা পৌরাণিক সাহিত্যের অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায়।
আপনার পরিবারে দেবী মনসার পুজোর কী কী রীতি রয়েছে? আপনাদের এলাকায় মনসার কোন কাহিনি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, কমেন্টে জানাতে পারেন।



