কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান ঘিরে তৈরি হল নতুন বিতর্ক। শনিবার পরিদর্শনের সময় একটি শিশুর জন্য স্টোভে দুধ গরম করতে থাকা এক ফুটপাতবাসী মহিলাকে কড়া ভাষায় প্রশ্ন করতে দেখা যায় পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে। ঘটনাটির ভিডিও এবং ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মন্ত্রীর আচরণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
অন্যদিকে, মন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য এবং দীর্ঘদিন ধরে দখল হয়ে থাকা জায়গা খালি করা প্রয়োজন। সেই অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একমত হলেও, উচ্ছেদের পদ্ধতি এবং ফুটপাতবাসীদের পুনর্বাসনের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক সামনে এসেছে।
কী ঘটেছিল পার্ক স্ট্রিটে?
শনিবার পার্ক স্ট্রিট এলাকায় ফুটপাতের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বেরিয়েছিলেন অগ্নিমিত্রা পাল। সেই সময় এক মহিলাকে স্টোভে দুধ গরম করতে দেখা যায়। তাঁর কাছেই ছিল একটি ছোট শিশু।
প্রকাশ্যে আসা ভিডিওতে দেখা যায়, বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী ওই মহিলাকে প্রশ্ন করছেন। মহিলা জানান, শিশুটির জন্যই দুধ গরম করছেন তিনি। এরপর তাঁর সঙ্গে থাকা কিছু জিনিস সরিয়ে দিতে বলা বা সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যও ভিডিওতে ধরা পড়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দৃশ্য সামনে আসার পর থেকেই মূল প্রশ্ন উঠেছে—ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন হলেও, সেই অভিযানের মধ্যে শিশুর খাবারের মতো মৌলিক প্রয়োজনকে প্রশাসন কীভাবে দেখবে?
ফুটপাত দখলমুক্ত করার যুক্তি কী?
অগ্নিমিত্রা পাল দীর্ঘদিন ধরেই কলকাতার ফুটপাতের দখলদারি নিয়ে সরব। এর আগেও তিনি পার্ক স্ট্রিট-সহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে ব্যবসা করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
মন্ত্রী ও প্রশাসনের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা। ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের হাঁটার জায়গা কমে যায় এবং যানবাহন ও পথচারীদের মধ্যে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, দখলমুক্ত করার পর যাঁরা ফুটপাতেই বসবাস করেন, তাঁদের পরবর্তী ঠিকানা কোথায়?
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ, উঠছে প্রশ্ন
পার্ক স্ট্রিটে সাম্প্রতিক অভিযানের পর ফুটপাতবাসীদের একটি অংশকে জায়গা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একইসঙ্গে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগও উঠেছে।
এই জায়গাতেই প্রশাসনিক নীতির মানবিক দিক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শহরের ফুটপাত অবশ্যই পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার। কিন্তু কোনও পরিবার, বিশেষত শিশু-সহ পরিবারকে সরিয়ে দেওয়ার পর তাদের থাকার ব্যবস্থা কী হবে—সেই প্রশ্নের উত্তরও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা বনাম ফুটপাতবাসীর পুনর্বাসন—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হয় না।
শ্রীলেখা মিত্রের তীব্র সমালোচনা
ঘটনাটি নিয়ে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র সমাজমাধ্যমে সরব হয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—অসহায় এক মা নিজের সন্তানের জন্য দুধ গরম করছিলেন; সেই পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র ফুটপাত দখলের নিয়মের চোখে না দেখে মানবিক দৃষ্টিতেও দেখা প্রয়োজন।
অগ্নিমিত্রা পালকে উদ্দেশ করে শ্রীলেখা মানুষের দুর্দশা ও ক্ষুধার বাস্তবতা বোঝার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে মন্ত্রীর মাতৃত্বের প্রসঙ্গ টেনে মানবিকতার প্রশ্ন তুলেছেন।
শ্রীলেখার এই পোস্টের পর সমাজমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক আরও জোরদার হয়।
ঋদ্ধি সেনও সরব
অভিনেতা ঋদ্ধি সেনও ঘটনাটি নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন। তিনি সরাসরি ওই ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি কলকাতার সৌন্দর্য, উন্নয়ন এবং ফুটপাতবাসীর বাস্তব জীবন—এই দুই ছবিকে পাশাপাশি দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঋদ্ধির বক্তব্যের মূল সুর, শহরকে সুন্দর করে তোলার অর্থ যেন শহরের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষকে দৃশ্যের বাইরে সরিয়ে দেওয়া না হয়। তাঁর মতে, একটি শহরের উন্নয়ন তখনই পূর্ণ অর্থ পায়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছয়।
শ্রীজাতের কবিতায়ও প্রতিবাদের সুর
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কবি শ্রীজাতও সমাজমাধ্যমে একটি কবিতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে ফুটপাথে বসবাসকারী মানুষের অনিশ্চিত জীবন, অভাব এবং সন্তানের খাবারের ব্যবস্থা করার লড়াই উঠে এসেছে।
কবিতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সরল অথচ গভীর প্রশ্ন—যে পরিবারটির কাছে শিশুর দুধ জোগাড় করাই প্রতিদিনের সংগ্রাম, তাদের জীবনের সেই বাস্তবতা শহর সাজানোর পরিকল্পনায় কতটা জায়গা পাবে?
শহর কি শুধু সৌন্দর্যের জন্য, নাকি মানুষের জন্যও?
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। কলকাতার ফুটপাত দখলমুক্ত করা নিয়ে প্রশাসনের যুক্তি অস্বীকার করার জায়গা নেই। পথচারীদের জন্য ফুটপাত খালি রাখা একটি নাগরিক প্রয়োজন।
কিন্তু একইসঙ্গে এটাও বাস্তব যে কলকাতার বহু ফুটপাতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গৃহহীনতা, দারিদ্র্য এবং অনিশ্চিত জীবনের গল্প। ফলে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়—বিকল্প আশ্রয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং পুনর্বাসনের প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।
বিশেষ করে কোনও পরিবারে শিশু থাকলে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সময় মানবিকতার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
অগ্নিমিত্রা পালের জন্য এ ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন সরকারের নগরোন্নয়ন নীতিতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়টি যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার পেয়েছে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানে তা স্পষ্ট। কিন্তু এই ধরনের অভিযানের সাফল্য শুধু কতটা ফুটপাত খালি হল, তা দিয়ে মাপা হবে না।
মানুষের চলাচলের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই উচ্ছেদ হওয়া মানুষের জীবনযাপন কীভাবে চলবে, সেটিও প্রশাসনিক সাফল্যের অংশ হওয়া উচিত। পার্ক স্ট্রিটের ঘটনা সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিই আরও জোরালো করে তুলেছে।
শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি শুধুমাত্র অগ্নিমিত্রা পালের আচরণ নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন—একটি শহরকে দখলমুক্ত ও সুন্দর করার প্রক্রিয়ায় তার সবচেয়ে অসহায় বাসিন্দাদের জন্য কতটা জায়গা রাখা হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনিক নির্দেশের চেয়েও বড়। কারণ ফুটপাত শুধু হাঁটার রাস্তা নয়; বহু মানুষের কাছে সেটিই তাদের জীবনের শেষ আশ্রয়।



