ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে সম্পর্কের ধরনও। একসময় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠত দীর্ঘ আলাপ, চিঠি কিংবা সামনাসামনি দেখা করার মাধ্যমে। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মেসেজ, ভিডিও কল এবং সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু সম্পর্ক যত দ্রুত তৈরি হচ্ছে, ভাঙছেও তত দ্রুত। আর সেই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক বাজারে জন্ম নিয়েছে এক সম্পূর্ণ নতুন পেশা— ‘Chief Breakup Officer’ (CBO) বা ব্রেকআপ অফিসার।
শুনতে অবাক লাগলেও, এই পেশার মূল কাজ হলো অন্য কারও হয়ে তার সঙ্গীকে সম্পর্ক শেষ হওয়ার খবর জানানো। অর্থাৎ, প্রেমিক বা প্রেমিকা নিজে না বলে একজন প্রশিক্ষিত পেশাদার ব্যক্তি ভদ্র, সংবেদনশীল ও পেশাদার উপায়ে বিচ্ছেদের বার্তা পৌঁছে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের চাকরির বিজ্ঞাপন ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে বেতনের অঙ্ক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই ধরনের পদে মাসিক আয় কয়েক লক্ষ টাকার সমান হতে পারে। তবে সংস্থা, দেশ এবং কাজের পরিধি অনুযায়ী এই পারিশ্রমিকের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
কী কাজ করতে হয় একজন ব্রেকআপ অফিসারের?
এই পেশার মূল উদ্দেশ্য শুধু একটি সম্পর্ক শেষ হওয়ার খবর জানিয়ে দেওয়া নয়। বরং এমনভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করা, যাতে দুই পক্ষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় অপমান, মানসিক আঘাত বা তিক্ততা কিছুটা হলেও কমে।
একজন ব্রেকআপ অফিসারের সাধারণ দায়িত্বের মধ্যে থাকে—
- সম্পর্ক শেষ করার বার্তা পেশাদারভাবে পৌঁছে দেওয়া।
- প্রয়োজনে ফোন, ভিডিও কল বা সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে আলোচনা করা।
- আবেগপ্রবণ পরিস্থিতি শান্তভাবে সামাল দেওয়া।
- ক্লায়েন্টের গোপনীয়তা রক্ষা করা।
- অপমানজনক বা আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার না করে সম্মানজনক বিচ্ছেদ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা।
অনেক সংস্থা এটিকে এক ধরনের Relationship Communication Service হিসেবেও দেখছে।
যোগ্যতা কী?
এই চাকরির বিজ্ঞাপন ভাইরাল হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এর অদ্ভুত যোগ্যতার শর্ত। কোথাও কোথাও মজার ছলে বলা হয়েছে, জীবনে একাধিকবার প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলে সেটিও বাড়তি সুবিধা হিসেবে ধরা হবে। যদিও বাস্তবে অধিকাংশ সংস্থা যোগাযোগ দক্ষতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সহানুভূতিশীল আচরণ এবং কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
অর্থাৎ, এটি কেবল মজার চাকরি নয়; মানুষের ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে জড়িত একটি সংবেদনশীল দায়িত্বও বটে।
কেন বাড়ছে এই পরিষেবার চাহিদা?
সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ সরাসরি বিচ্ছেদের কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। ফলে তারা প্রায়ই Ghosting-এর পথ বেছে নেন—অর্থাৎ, হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া, ব্লক করা বা কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই সম্পর্ক থেকে সরে যাওয়া।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই ধরনের আচরণ মানসিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কিছু সংস্থা দাবি করছে, হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার বদলে সম্মানজনকভাবে সম্পর্ক শেষ করাই বেশি মানবিক। আর সেই কারণেই ব্রেকআপ অফিসারের মতো পরিষেবার চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
তবে কি সম্পর্কও এখন আউটসোর্স হচ্ছে?
এই নতুন পেশাকে ঘিরে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
একাংশের মতে, এটি আধুনিক জীবনের বাস্তব প্রয়োজন। অনেক সময় সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে এবং নিরপেক্ষ তৃতীয় ব্যক্তি পরিস্থিতি শান্তভাবে সামাল দিতে পারেন।
অন্যদিকে, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও সাহস। ভালোবাসা যেমন নিজের মুখে প্রকাশ করা উচিত, তেমনি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তও নিজের দায়িত্বে জানানো উচিত। অন্য কাউকে দিয়ে সেই কাজ করানো হলে মানুষ ধীরে ধীরে কঠিন কথোপকথন এড়িয়ে যাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
তাদের মতে, এটি কেবল একটি নতুন চাকরি নয়; বরং আধুনিক সমাজে মানুষের যোগাযোগ দক্ষতা ও আবেগ প্রকাশের ধরন কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
প্রযুক্তি ও সম্পর্ক—কোন দিকে এগোচ্ছে পৃথিবী?
সোশ্যাল মিডিয়া, ডেটিং অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সম্পর্কের সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সবকিছু সামলাত, এখন জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও পেশাদার পরিষেবার ব্যবহার বাড়ছে। সেই ধারাবাহিকতায় ব্রেকআপ অফিসারের মতো পেশাও আলোচনায় এসেছে।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি বিচ্ছেদের জন্য পেশাদার কর্মকর্তা নিয়োগ করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কি ভালোবাসার প্রস্তাব দেওয়ার জন্যও আলাদা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ হবে? উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।
উপসংহার
‘ব্রেকআপ অফিসার’ পেশাটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী এবং অনেকের কাছে বিস্ময়কর। কেউ এটিকে আধুনিক জীবনের বাস্তব সমাধান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি মানবিক সম্পর্কের স্বাভাবিক উষ্ণতা কমিয়ে দিচ্ছে। তবে এতটুকু নিশ্চিত—এই চাকরি শুধু ভাইরাল খবর নয়, বরং পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। আগামী দিনে এই ধরনের পরিষেবা কতটা জনপ্রিয় হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



