পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভোটের আগে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তথাকথিত ‘দুর্গাশ্রী’ প্রকল্প। সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একাধিক পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় এলে রাজ্যের প্রতিটি মহিলাকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এমনকি কোথাও কোথাও বলা হচ্ছে, ইতিমধ্যেই নাকি ফর্ম ফিল-আপ শুরু হয়ে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল, আবার একইসঙ্গে বিভ্রান্তিও।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই ‘দুর্গাশ্রী’ প্রকল্প কি আদৌ বাস্তব? নাকি এটি শুধুই গুজব?
এই মুহূর্তে বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এই প্রকল্পের কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই। রাজ্য সরকার বা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্গাশ্রী’ নামে কোনো প্রকল্প ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি নির্বাচনী ইস্তাহারেও এই ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতির উল্লেখ পাওয়া যায়নি। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই দাবিগুলি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কিছু জনপ্রিয় প্রকল্প চালু রয়েছে। যেমন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’, ‘যুবশ্রী’ ইত্যাদি। এই প্রকল্পগুলি রাজ্যের নারী ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের মাধ্যমে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ফলে বহু পরিবার উপকৃত হয়েছে। এই ধরনের প্রকল্পগুলির সাফল্যই হয়তো নতুন করে ‘দুর্গাশ্রী’ নিয়ে জল্পনা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে, ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলির তরফে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। বিরোধী দলগুলিও নিজেদের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। যেমন বিজেপি ইতিমধ্যেই মহিলাদের জন্য মাসিক ভাতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এমনকি কিছু জায়গায় ‘অন্নপূর্ণা’ প্রকল্পের ফর্ম ফিল-আপ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই আবহেই ‘দুর্গাশ্রী’ নিয়ে গুজব আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভারতের নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, একবার ভোটের তারিখ ঘোষণা হয়ে গেলে কোনো সরকার নতুন করে আর্থিক অনুদান বা নতুন প্রকল্প ঘোষণা করতে পারে না। এটিকে বলা হয় ‘আদর্শ আচরণবিধি’। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়ের পর এই নিয়ম কার্যকর হয়েছে। ফলে এই সময়ের মধ্যে নতুন কোনো প্রকল্প চালু করা আইনত সম্ভব নয়। এই বিষয়টি মাথায় রাখলেই ‘দুর্গাশ্রী’ প্রকল্পের দাবিগুলির অসারতা সহজেই বোঝা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের ভুয়ো খবর ছড়ানো এখন এক সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় মানুষ যাচাই না করেই এই তথ্যগুলো বিশ্বাস করে ফেলেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—যে কোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে সেটির সত্যতা যাচাই করা। সরকারি ওয়েবসাইট, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা সরকারি ঘোষণার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত তথ্য পাওয়া সম্ভব। কোনো অজানা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা ফরওয়ার্ড মেসেজের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘দুর্গাশ্রী’ প্রকল্প নিয়ে বর্তমানে যে চর্চা চলছে, তা মূলত একটি গুজব ছাড়া আর কিছুই নয়। রাজ্য সরকার বা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়নি। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং অন্যদেরও সচেতন করা এখন সময়ের দাবি।



