ভারতীয় ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই কয়েকটি নাম স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে। মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মা—তিনজনই নিজ নিজ সময়ে ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। কেউ বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন, কেউ ধারাবাহিক জয় এনে দিয়েছেন, আবার কেউ আধুনিক ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছেন। তবে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে জয়ের শতাংশ বা Win Percentage-এর ভিত্তিতে বিচার করলে ছবিটা অনেকটাই আলাদা।
উপলব্ধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের হয়ে অন্তত ১০টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়কদের মধ্যে সর্বোচ্চ জয়ের হার রয়েছে রোহিত শর্মার। তিনি মোট ৬২টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তার মধ্যে ৪৯টিতে দলকে জয় এনে দিয়েছেন। ফলে তাঁর জয়ের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯.০৩ শতাংশ, যা ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা।
রোহিত শর্মার নেতৃত্বের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন, বোলারদের সঠিক ব্যবহার এবং ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বদল—এই সব ক্ষেত্রেই তিনি সফল নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অধীনে ভারত একাধিক দ্বিপাক্ষিক সিরিজে আধিপত্য দেখিয়েছে এবং আইসিসি টুর্নামেন্টেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।
তবে শুধুমাত্র জয়ের শতাংশ দিয়েই একজন অধিনায়কের অবদান বিচার করা যায় না। ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির নাম আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বিশেষ মর্যাদার। ধোনি ৭২টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের নেতৃত্ব দেন এবং তার মধ্যে ৪১টি ম্যাচে জয় পান। তাঁর জয়ের হার প্রায় ৫৬.৯৪ শতাংশ হলেও, অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০০৭ সালে প্রথম আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়। সেই ট্রফিই ভারতীয় ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টি যুগের সূচনা করেছিল।
অন্যদিকে বিরাট কোহলিও দীর্ঘ সময় ভারতের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক ছিলেন। তিনি মোট ৫০টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ৩০টিতে জয় পান। তাঁর জয়ের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। কোহলির নেতৃত্বে ভারত ধারাবাহিকভাবে আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকেছে এবং একাধিক বিদেশ সফরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। যদিও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ তিনি অধিনায়ক হিসেবে পাননি, তবুও তাঁর আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং ফিটনেস সংস্কৃতি ভারতীয় ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্বে এসেছে নতুন প্রজন্ম। সূর্যকুমার যাদবও অধিনায়ক হিসেবে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছেন। সীমিত সংখ্যক ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েই তিনি প্রায় ৭৬.৯২ শতাংশ জয়ের হার অর্জন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারত আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেছে এবং নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দিয়েছে। যদিও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের জন্য আরও সময় প্রয়োজন, তবুও শুরুটা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
এই তালিকায় হার্দিক পান্ডিয়ার নামও উল্লেখযোগ্য। অলরাউন্ডার হিসেবে নিজের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অধিনায়ক হিসেবেও তিনি ভালো সাফল্য পেয়েছেন। তাঁর জয়ের হার প্রায় ৬২.৫ শতাংশ, যা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও ইঙ্গিত করে।
ভারতের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্বের ইতিহাস শুরু হয় ২০০৬ সালে। সেই সময় প্রথম অধিনায়ক হিসেবে বীরেন্দ্র শেবাগ একটি ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেন এবং সেই ম্যাচেই ভারত জয় পায়। এরপর ধোনি, সুরেশ রায়না, অজিঙ্কা রাহানে, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, হার্দিক পান্ডিয়া, সূর্যকুমার যাদবসহ একাধিক ক্রিকেটার এই দায়িত্ব সামলেছেন।
তবে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন অধিনায়কের মূল্যায়ন শুধুমাত্র জয়ের শতাংশ দিয়ে করা উচিত নয়। আইসিসি ট্রফি, বড় ম্যাচে পারফরম্যান্স, দল গঠন, তরুণ ক্রিকেটারদের তৈরি করা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ধোনির অর্জন যেমন অনন্য, তেমনি রোহিতের ধারাবাহিক সাফল্য এবং কোহলির আক্রমণাত্মক নেতৃত্বও ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান বলছে, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে জয়ের শতাংশের বিচারে ভারতের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক বর্তমানে রোহিত শর্মা। তবে আইসিসি ট্রফি, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং নেতৃত্বের ধরন বিচার করলে ধোনি, কোহলি এবং রোহিত—তিনজনেরই অবদান ভারতীয় ক্রিকেটে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাই ‘সেরা অধিনায়ক’ নির্বাচন অনেকটাই নির্ভর করে কোন মানদণ্ডকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার ওপর।
আপনার মতে ভারতের সর্বকালের সেরা টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক কে—মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি, নাকি রোহিত শর্মা? নিজের মতামত জানাতে পারেন মন্তব্যে।



