বর্ষাকালে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বজ্রপাতের খবর মিলছে। বজ্রপাতের সময় বাইরে থাকা যেমন প্রাণঘাতী হতে পারে, তেমনই ঘরের ভেতরে থাকা দামি ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতিও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অনেকেই মনে করেন, সুইচ অফ করে দিলেই টিভি, ফ্রিজ বা এসি নিরাপদ থাকে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক লাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভোল্টেজ বা পাওয়ার সার্জ (Power Surge) ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এই অতিরিক্ত ভোল্টেজ মুহূর্তের মধ্যে টিভি, ফ্রিজ, এসি, কম্পিউটার, ওয়াই-ফাই রাউটার কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সংবেদনশীল সার্কিট ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চললে বড় আর্থিক ক্ষতি এবং দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
কেন বজ্রপাতের সময় ইলেকট্রনিক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ পরিবহণ লাইনে হঠাৎ করে অত্যন্ত উচ্চ ভোল্টেজ সৃষ্টি হতে পারে। এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহকে বলা হয় সার্জ। বিদ্যুতের মূল লাইন ছাড়াও কেবল টিভি, ইন্টারনেটের তার বা টেলিফোন লাইনের মাধ্যমেও এই সার্জ ঘরের ভেতরে পৌঁছে যেতে পারে।
ফলে আধুনিক স্মার্ট টিভি, ইনভার্টার এসি, ফ্রিজ, ডেস্কটপ কম্পিউটার কিংবা রাউটারের মাদারবোর্ড, পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক অংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শর্ট সার্কিটের কারণে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটতে পারে।
শুধু সুইচ অফ করলেই কি যথেষ্ট?
অনেকেই শুধুমাত্র সুইচ অফ করে নিশ্চিন্ত হয়ে যান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ পদ্ধতি নয়।
কারণ অধিকাংশ সুইচ বোর্ডে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও প্লাগটি সকেটে লাগানো থাকলে সার্জের প্রভাব থেকে যন্ত্র পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে না। তাই বজ্রপাত শুরু হলে বা আবহাওয়া দপ্তরের পক্ষ থেকে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়ের সতর্কতা জারি হলে সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হল সংশ্লিষ্ট যন্ত্রের প্লাগ সম্পূর্ণ খুলে রাখা।
কোন কোন যন্ত্রের প্লাগ অবশ্যই খুলে রাখবেন?
বজ্রপাতের সময় নিচের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রগুলির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা উচিত—
- টেলিভিশন
- রেফ্রিজারেটর
- এয়ার কন্ডিশনার (এসি)
- ডেস্কটপ কম্পিউটার
- ল্যাপটপ চার্জার
- ওয়াই-ফাই রাউটার
- সেট-টপ বক্স
- ডিশ টিভির কেবল সংযোগ
- গেমিং কনসোল
- স্মার্ট হোম ডিভাইস
বিশেষ করে টিভির ডিশ কেবল এবং ইন্টারনেট লাইনের সংযোগ খুলে রাখা অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
বাইরে যাওয়ার আগে কী করবেন?
যদি আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়ের সম্ভাবনা থাকে এবং সেই সময় আপনি বাড়িতে না থাকেন, তাহলে বেরোনোর আগে কয়েকটি সতর্কতা নেওয়া ভালো।
সব গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক যন্ত্রের প্লাগ খুলে রাখুন। প্রয়োজনে বাড়ির মূল সার্কিট ব্রেকার (MCB) বন্ধ করে যেতে পারেন, যদি তাতে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক পরিষেবার সমস্যা না হয়। এতে বজ্রপাতজনিত সার্জ থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পাওয়া যায়।
সার্জ প্রোটেক্টর কেন ব্যবহার করবেন?
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের সার্জ প্রোটেক্টর পাওয়া যায়। এগুলি অতিরিক্ত ভোল্টেজকে নিয়ন্ত্রণ করে সংযুক্ত যন্ত্রগুলিকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দামি টিভি, কম্পিউটার, রাউটার কিংবা হোম অফিসের ইলেকট্রনিক্সের জন্য ভালো মানের সার্জ প্রোটেক্টর ব্যবহার করা একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, খুব শক্তিশালী বজ্রপাতের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সার্জ প্রোটেক্টরের উপর নির্ভর না করে প্লাগ খুলে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ।
বজ্রপাতের সময় যে ভুলগুলি একেবারেই করবেন না
বজ্রপাতের সময় অনেকেই অজান্তে এমন কিছু কাজ করেন যা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
- মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জে বসিয়ে ব্যবহার করবেন না।
- খোলা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিও বা ছবি তুলবেন না।
- বৈদ্যুতিক যন্ত্রে অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
- ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক সুইচ বা প্লাগ স্পর্শ করবেন না।
- প্রয়োজনে ইনভার্টার বা UPS-এর অবস্থাও পরীক্ষা করুন।
বজ্রপাত থামার পর কী করবেন?
বজ্রপাত পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর এবং আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে সব যন্ত্রের প্লাগ পুনরায় সংযোগ দিন। যদি বিদ্যুতের ভোল্টেজ অস্বাভাবিক ওঠানামা করে, তাহলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পরে যন্ত্র চালু করাই ভালো।
যদি কোনও যন্ত্র থেকে পোড়া গন্ধ, অস্বাভাবিক শব্দ বা স্পার্ক দেখা যায়, তাহলে সেটি ব্যবহার না করে দ্রুত দক্ষ টেকনিশিয়ানের সাহায্য নিন।
উপসংহার
বজ্রপাতের সময় সামান্য অসাবধানতায় হাজার হাজার টাকার ইলেকট্রনিক যন্ত্র নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অথচ কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললেই এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। শুধু সুইচ অফ করলেই নয়, প্লাগ খুলে রাখা, সার্জ প্রোটেক্টর ব্যবহার, ডিশ ও ইন্টারনেট কেবল বিচ্ছিন্ন করা এবং বজ্রপাত চলাকালীন চার্জিং এড়িয়ে চলা—এই ছোট ছোট অভ্যাসই আপনার বাড়ির টিভি, ফ্রিজ, এসি, কম্পিউটার এবং অন্যান্য মূল্যবান ইলেকট্রনিক্সকে নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সচেতন থাকুন, নিরাপদ থাকুন।



