একটি পরিবার, যেখানে হাসি-খুশি থাকার কথা ছিল—সেই ঘরেই ছড়িয়ে পড়ল রক্তের স্রোত। এমন এক ভয়াবহ ঘটনা, যা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। নিজের দুই মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে এক বাবার বিরুদ্ধে। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো।
উত্তর ভারতের কানপুর শহরে ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। রবিবার ভোররাতে ১১ বছরের যমজ দুই কন্যা সন্তানের গলা কেটে খুন করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের বাবা শশীরঞ্জন মিশ্রকে। ঘটনাস্থলের ছবি এতটাই ভয়ঙ্কর যে, তা সহজে ভোলার মতো নয়—রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে, নিথর হয়ে পড়ে আছে দুই ছোট্ট প্রাণ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভোর সাড়ে চারটার দিকে জরুরি নম্বর ১১২-এ একটি ফোন আসে। ফোনের ওপার থেকে নিজেই স্বীকার করেন অভিযুক্ত বাবা যে, তিনি তাঁর দুই মেয়েকে হত্যা করেছেন। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখে ঘরের ভেতরে পড়ে রয়েছে দুই শিশুর রক্তাক্ত দেহ। পাশে বসে আছেন অভিযুক্ত, আর কাছেই পড়ে রয়েছে রক্তমাখা ধারালো অস্ত্র।
এই নির্মম ঘটনার পেছনে কী কারণ? সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, শশীরঞ্জন বেশ কিছুদিন ধরেই অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। তাঁর স্ত্রী রেশমা জানিয়েছেন, “তিনি অনেকদিন ধরেই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায়ই বলতেন, আমি যেন ছেলেকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাই। মেয়েদের দায়িত্ব তিনি একাই নিতে চান।”
শনিবার রাতেও নাকি একই ঘটনা ঘটে। রাতের খাবারের পর তিনি দুই মেয়েকে নিজের সঙ্গে ঘুমাতে নিয়ে যান। মাঝরাতে একবার বাথরুমে যাওয়ার অজুহাতে একজন মেয়েকে নিয়ে বের হন। তারপর আবার ঘরে ফিরে আসেন। এরপর কী ঘটেছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও, কয়েক ঘণ্টা পরেই আসে সেই ভয়ঙ্কর ফোন—যেখানে তিনি নিজেই খুনের কথা স্বীকার করেন।
এই ঘটনার পর গোটা এলাকা স্তব্ধ। প্রতিবেশীদের অনেকেই জানিয়েছেন, পরিবারটি বাইরে থেকে স্বাভাবিক বলেই মনে হতো। কিন্তু ভিতরে যে এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল, তা কেউ আঁচ করতে পারেননি।
পুলিশ ইতিমধ্যেই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে এবং তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, মানসিক অবসাদ, আর্থিক চাপ এবং ব্যক্তিগত অস্থিরতা এই ঘটনার পেছনে বড় কারণ হতে পারে। জানা গেছে, সম্প্রতি তিনি চাকরি ছেড়ে নতুন ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করছিলেন, যা সফল হয়নি। সেই চাপ থেকেই কি এই চরম সিদ্ধান্ত? তদন্তেই মিলবে উত্তর।
এই ঘটনা আবারও সামনে আনছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব কতটা? অনেক সময় সমাজে পুরুষদের মানসিক সমস্যা বা অবসাদকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তারা নিজের ভেতরের যন্ত্রণা প্রকাশ করতে পারেন না, যার ফল কখনও কখনও এমন ভয়াবহ রূপ নেয়।
একই সঙ্গে, এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবারের ভেতরে ছোটখাটো অস্বাভাবিক আচরণকেও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসা ও পরামর্শ পেলে হয়তো এই দুই নিরপরাধ প্রাণকে বাঁচানো যেত।
আজ দুইটি শিশুর জীবন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের গল্প আমাদের জন্য এক কঠিন শিক্ষা হয়ে রইল। সমাজ হিসেবে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে, এবং পরিবারের ভেতরের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শেষ প্রশ্নটা থেকেই যায়—কোন পরিস্থিতিতে একজন বাবা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এর উত্তর খোঁজার দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়, আমাদের সমাজেরও।



