জলেই তাঁর স্বস্তি, অথচ ডাঙায় পা রাখলেই শুরু হয় অসহ্য যন্ত্রণা—গত কয়েক বছর ধরে এমনই এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার কিশোর ইকবালের। পরিবারের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে পুকুরের জলে থাকতেই স্বস্তি পান তিনি। কখনও কয়েক ঘণ্টা, কখনও আবার টানা কয়েক দিন জলের মধ্যেই থাকার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।
১৬ বছরের এই কিশোরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিকের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। খাওয়া থেকে বিশ্রাম—অনেকটা সময়ই কাটে জলের মধ্যে। আর এই ঘটনাকে ঘিরেই এলাকায় ছড়িয়েছে নানা ধরনের আলোচনা। কেউ বলছেন অজানা কোনও শারীরিক সমস্যার কথা, আবার স্থানীয় স্তরে কেউ কেউ এটিকে অদৃশ্য শক্তির সঙ্গেও জুড়ে দেখছেন।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এমন ঘটনাকে অলৌকিক বলে ধরে নেওয়ার আগে সঠিক কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
কেন জলে থাকতেই স্বস্তি ইকবালের?
পরিবারের দাবি, ডাঙায় উঠে এলেই ইকবালের শরীরে তীব্র জ্বালা ও অস্বস্তি শুরু হয়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সেই অনুভূতি এতটাই কষ্টকর যে জলেই ফিরে গেলে তিনি তুলনামূলক স্বস্তি অনুভব করেন।
স্থানীয়দের দাবি, কখনও কখনও ইকবাল একটানা চার থেকে সাত দিন পর্যন্ত জলের মধ্যে থাকেন। তবে এই ধরনের দীর্ঘ সময় জলে থাকার বিষয়টি স্বাধীনভাবে চিকিৎসাগতভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
দীর্ঘক্ষণ জলে থাকার ফলে তাঁর শরীরেও বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছে। হাত-পায়ের ত্বকের পরিবর্তন, সর্দি-কাশি এবং নিউমোনিয়ার মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।
‘অদৃশ্য শক্তি’র দাবি কতটা সত্য?
ইকবালের ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় এলাকায় নানা ধরনের গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, জল থেকে উঠলেই তাঁর আচরণ বা শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের পিছনে কোনও অজানা শক্তির প্রভাব থাকতে পারে।
কিন্তু এই ধরনের দাবির পক্ষে কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সামনে নেই। কোনও ব্যক্তির অস্বাভাবিক শারীরিক উপসর্গকে শুধুমাত্র অলৌকিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
তাই ইকবালের ক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন চিকিৎসকদের মাধ্যমে সমস্যাটির প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা।
বিরল ত্বকের সমস্যার সঙ্গে কি কোনও সম্পর্ক রয়েছে?
ইকবালের উপসর্গের বর্ণনা শুনে কিছু বিরল শারীরিক অবস্থার কথা মনে আসতে পারে। তার মধ্যে একটি হল Aquagenic Pruritus। এই অবস্থায় জল শরীরে লাগার পর ত্বকে দৃশ্যমান কোনও বিশেষ দাগ না থাকলেও তীব্র চুলকানি, জ্বালা বা অস্বস্তি হতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শুধু উপসর্গের বর্ণনা শুনে ইকবালের এই রোগ রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। প্রয়োজন চিকিৎসকের পরীক্ষা ও যথাযথ রোগ নির্ণয়।
আরও একটি বিরল সমস্যা হল Aquagenic Urticaria, যেখানে জলের সংস্পর্শে ত্বকে চাকা, লালচে দাগ বা অন্যান্য অ্যালার্জির মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু ইকবালের ক্ষেত্রে এই রোগ রয়েছে—এমন কোনও নিশ্চিত চিকিৎসা-প্রতিবেদন প্রকাশ্যে নেই।
জলে দীর্ঘক্ষণ থাকা কেন বিপজ্জনক?
জলে দীর্ঘ সময় শরীর ডুবে থাকলে ত্বক নরম হয়ে যাওয়া, সংক্রমণের ঝুঁকি এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা-সহ একাধিক শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত নয় এমন পুকুরের জলে দীর্ঘক্ষণ থাকা ত্বক ও শ্বাসযন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই কোনও শারীরিক সমস্যার কারণে কেউ জলে থাকতে স্বস্তি পেলেও সেটিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ইকবালের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই অসুস্থতার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা চিকিৎসা
পরিবারের আর্থিক সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা করানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইকবালের সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা এবং ত্বক ও স্নায়ু সংক্রান্ত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কোনও বিরল রোগের সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকরাই নির্ধারণ করবেন কী ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন এবং কীভাবে চিকিৎসা করা হবে।
স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে কি ইকবাল?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটাই। পাঁচ বছর ধরে এমন অস্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্যে থাকা একজন কিশোরের ক্ষেত্রে সমস্যাটির সঠিক কারণ জানা অত্যন্ত জরুরি।
এটি কোনও বিরল শারীরিক সমস্যা, অন্য কোনও চিকিৎসাগত জটিলতা, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও কারণ—পরীক্ষা ছাড়া তা বলা সম্ভব নয়।
তাই ইকবালের ঘটনাকে ‘অভিশাপ’ বা ‘অলৌকিক শক্তি’ হিসেবে দেখার বদলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কারণ রহস্য যতই গভীর হোক, একজন কিশোরের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



