Friday, August 28, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটNRS হাসপাতালে নার্সের রহস্যমৃত্যু: ফেন্টানিলের ভায়াল নিয়ে শৌচালয়ে গিয়েছিলেন, তদন্তে একাধিক প্রশ্ন

NRS হাসপাতালে নার্সের রহস্যমৃত্যু: ফেন্টানিলের ভায়াল নিয়ে শৌচালয়ে গিয়েছিলেন, তদন্তে একাধিক প্রশ্ন

কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ফের চাঞ্চল্যকর ঘটনা। স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-এর শৌচালয় থেকে উদ্ধার হল এক তরুণী নার্সের দেহ। মৃতের নাম রূপালী বর্মণ, বয়স ৩০ বছর। দমদমের বাসিন্দা ওই নার্স ঘটনার সময় হাসপাতালেই কর্তব্যরত ছিলেন।

প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকদের অনুমান, অতিরিক্ত মাত্রায় ফেন্টানিল প্রয়োগের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি আত্মহত্যা, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ ঘটনাস্থলে মেলেনি কোনও সুইসাইড নোট, আবার শরীরেও পাওয়া যায়নি দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন।

কীভাবে ঘটল NRS হাসপাতালে নার্সের মৃত্যু?

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাত ৮টা নাগাদ স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-তে ডিউটিতে যোগ দেন রূপালী। রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ তিনি শৌচালয়ে যান।

দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও তিনি কাজে ফিরে না আসায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়। দরজা বন্ধ থাকায় বাইরে থেকে ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এরপর মহম্মদ সামশের আলম ও শ্রেয়া গাইন নামে দুই কর্মী শৌচাগারের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকেন। সেখান থেকে অচেতন অবস্থায় রূপালীকে উদ্ধার করে দ্রুত বেডে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল ঘিরে রহস্য

ঘটনার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ফেন্টানিলের ভায়াল। হাসপাতাল সূত্রে দাবি, ডিউটিতে যোগ দেওয়ার পর রূপালী নার্সিং স্টেশন থেকে ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল নিয়ে শৌচালয়ের দিকে গিয়েছিলেন।

ফেন্টানিল একটি শক্তিশালী ওপিওয়েড ওষুধ। চিকিৎসাক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ বা অ্যানেস্থেশিয়ার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। তবে অতিরিক্ত মাত্রা প্রাণঘাতী হতে পারে।

তাই প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে তিনটি ভায়াল তাঁর হাতে এল এবং সেগুলি ব্যবহারের বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার নজরে এসেছিল কি না। তবে এই তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ বা ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনও সম্ভব নয়।

আত্মহত্যা, নাকি অন্য কোনও সম্ভাবনা?

রূপালীর দেহে কোনও স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল থেকেও কোনও সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়নি বলে জানা গিয়েছে।

ফলে প্রাথমিক অনুমানের পাশাপাশি আরও একাধিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ওষুধ কীভাবে তাঁর শরীরে প্রবেশ করল, তিনি নিজেই তা প্রয়োগ করেছিলেন কি না, নাকি অন্য কোনও ব্যক্তি এর সঙ্গে যুক্ত—তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।

এই কারণেই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ভায়ালগুলির হিসাব, হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণ ও বিতরণের রেকর্ড এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

ঘটনাস্থলে পুলিশ, তদন্তে হোমিসাইড শাখা

ঘটনার খবর পেয়ে এন্টালি থানার পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছয়। পরে লালবাজারের হোমিসাইড শাখার আধিকারিকরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

রহস্যমৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্য সামনে না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন

ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ওষুধ ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

একজন কর্তব্যরত নার্স যদি সত্যিই নার্সিং স্টেশন থেকে একাধিক ফেন্টানিলের ভায়াল নিয়ে নির্জন জায়গায় যেতে পারেন, তাহলে সেই ওষুধের ইস্যু ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নজরদারি ছিল—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিশেষ করে উচ্চ-ঝুঁকির ওষুধের ক্ষেত্রে কে কতটা ওষুধ নিলেন, কোথায় ব্যবহার হল এবং অব্যবহৃত ওষুধের হিসাব কীভাবে রাখা হয়—এই প্রশ্নগুলির উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আগের ঘটনাগুলিও কি নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছে?

কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তা নিয়ে এর আগেও একাধিক ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। ফলে NRS-এর এই ঘটনা সামনে আসার পর হাসপাতালের কর্মী ও রোগীদের নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে অতীতের ঘটনাগুলির সঙ্গে বর্তমান মৃত্যুর সরাসরি যোগ রয়েছে—এমন কোনও তথ্য এখনও সামনে আসেনি। তাই প্রতিটি ঘটনাকে তার নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতেই দেখা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শন

বৃহস্পতিবার সকালে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হাসপাতালে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। প্রশাসনের তরফে ঘটনাটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু ঘটনাস্থল পরিদর্শনেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। কীভাবে ফেন্টানিলের মতো শক্তিশালী ওষুধ নার্সের কাছে পৌঁছল, সেটি ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় কোনও ঘাটতি ছিল কি না এবং ঘটনার সময় হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী অবস্থায় ছিল—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর তদন্ত থেকেই পাওয়া সম্ভব।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়

NRS হাসপাতালে রূপালী বর্মণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে গুরুতর এবং উদ্বেগজনক ঘটনা। কিন্তু প্রাথমিক অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেন্সিক পরীক্ষা এবং পুলিশের তদন্ত—এই তিনটি বিষয়েই নির্ভর করবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন। একইসঙ্গে হাসপাতালের ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—ফেন্টানিলের ভায়ালগুলি কীভাবে রূপালীর হাতে পৌঁছেছিল এবং ঠিক কী ঘটেছিল হাসপাতালের ওই শৌচালয়ে? তদন্তের অগ্রগতি ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টই সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments