আইপিএল ২০২৬-এ এক নতুন নাম এখন গোটা ক্রিকেট বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে—বৈভব সূর্যবংশী। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই যেভাবে দেশের সেরা সেরা বোলারদের বিরুদ্ধে নির্ভীক ব্যাটিং করছেন, তাতে অনেকেই তাঁকে ভবিষ্যতের সুপারস্টার হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। রাজস্থান রয়্যালসের জার্সিতে তাঁর বিধ্বংসী ইনিংসগুলো ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। কেউ বলছেন “নতুন সেহওয়াগ”, কেউ আবার তুলনা টানছেন যুবরাজ কিংবা গিলক্রিস্টের সঙ্গে। কিন্তু এত দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরেও এখনও পর্যন্ত টিম ইন্ডিয়ার দরজা খুলছে না এই কিশোর ব্যাটারের জন্য। প্রশ্ন উঠছে, মাঠে আগুন ঝরিয়েও কেন জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছেন না বৈভব?
আসলে শুধুমাত্র আইপিএলে ভালো পারফরম্যান্স করলেই জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া যায় না। নির্বাচকদের ভাবনায় আরও অনেক বিষয় কাজ করে। আর সেই কারণেই এখনই ভারতের সিনিয়র দলে বৈভবের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ।
সবথেকে বড় কারণ অবশ্যই তাঁর বয়স। বৈভব সম্প্রতি ১৫ বছরে পা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী ১৫ বছর বয়স হলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এত কম বয়সে ভারতীয় সিনিয়র দলে জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ভারতীয় ক্রিকেটে এখনও পর্যন্ত এমন নজির নেই যেখানে মাত্র ১৫ বছরের কোনো ক্রিকেটার সরাসরি জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচকরা সাধারণত তরুণ ক্রিকেটারদের ধীরে ধীরে তৈরি করতে চান, যাতে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত চাপ তাদের ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।
আরেকটি বড় কারণ হলো অভিজ্ঞতার অভাব। আইপিএলে কয়েকটি বিস্ফোরক ইনিংস খেললেও এখনও পর্যন্ত বৈভবের দীর্ঘমেয়াদি ঘরোয়া ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা খুব সীমিত। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিং নজর কাড়লেও এখনও তিনি রঞ্জি ট্রফি, বিজয় হাজারে কিংবা দুলিপ ট্রফির মতো বড় মঞ্চে নিজেকে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করার সুযোগ পাননি। ভারতীয় নির্বাচকরা সাধারণত এমন ক্রিকেটারদেরই গুরুত্ব দেন, যারা বিভিন্ন ফরম্যাটে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈভবের টেস্ট ক্রিকেট কিংবা ওয়ানডে ক্রিকেটে দক্ষতা এখনও পরীক্ষা করা হয়নি। টি-টোয়েন্টিতে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলা আর পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচে ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করা একেবারেই আলাদা ব্যাপার। ফলে নির্বাচকরা হয়তো চাইবেন, আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে লাল বলের ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করুন বৈভব। তারপরই তাঁর জন্য খুলতে পারে জাতীয় দলের দরজা।
এছাড়াও ভারতের বর্তমান টপ অর্ডারে প্রতিযোগিতা ভয়ঙ্কর কঠিন। যশস্বী জয়সওয়াল ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছেন। শুভমন গিল নিয়মিত ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সঞ্জু স্যামসন, অভিষেক শর্মা, ইশান কিষাণ, প্রভসিমরন সিং, প্রিয়াংশ আর্যদের মতো একাধিক ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য লড়াই করছেন। ফলে এই মুহূর্তে বৈভবকে সুযোগ দিতে গেলে নির্বাচকদের কাউকে বাদ দিতে হবে, যা মোটেও সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বৈভবকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হিসেবে দেখতে চাইছে। খুব অল্প বয়সে অতিরিক্ত আলোচনায় চলে আসলে অনেক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অতীতে। সেই ভুল আর করতে চাইছে না ভারতীয় ক্রিকেট। তাই হয়তো এখনই তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপের মধ্যে না ফেলে ধীরে ধীরে তৈরি করা হচ্ছে।
তবে এটাও সত্যি যে, বৈভব যেভাবে ব্যাট করছেন, তাতে খুব বেশিদিন তাঁকে জাতীয় দলের বাইরে রাখা সম্ভব হবে না। তাঁর টাইমিং, পাওয়ার হিটিং আর আত্মবিশ্বাস ইতিমধ্যেই ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মুগ্ধ করেছে। আইপিএলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বজায় রাখতে পারলে খুব দ্রুতই ভারত ‘এ’ দল কিংবা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠতে পারেন তিনি।
সবমিলিয়ে বলা যায়, বৈভব সূর্যবংশীর টিম ইন্ডিয়ায় সুযোগ না পাওয়ার পেছনে কোনো রাজনীতি বা অবহেলা নেই। বরং নির্বাচকরা তাঁকে আরও পরিণত এবং সম্পূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে তৈরি করতে চাইছেন। বয়স, অভিজ্ঞতা এবং ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতার কারণেই আপাতত অপেক্ষা করতে হচ্ছে এই বিস্ময় বালককে। তবে ক্রিকেটপ্রেমীদের বিশ্বাস, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন পোস্টার বয় হয়ে উঠতে পারেন এই কিশোর তারকা।



