রাজ্যের ব্যস্ত রাস্তা ও হাইওয়েগুলিতে টোটো এবং ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে এবার কড়া অবস্থান নিল পরিবহণ দফতর। জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক এবং অন্যান্য প্রধান সড়কে ই-রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে আগের বিধিনিষেধ কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চালকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ রাজ্যজুড়ে টোটো পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমন নয়। মূলত যে রাস্তাগুলিতে ই-রিকশার চলাচল অনুমোদিত নয়, সেখানে নিয়ম কার্যকর করতেই প্রশাসনের এই উদ্যোগ।
কী নির্দেশ দিয়েছে পরিবহণ দফতর?
পরিবহণ দফতরের প্রধান সচিব রবি ইন্দর সিং রাজ্য পুলিশকে একটি নির্দেশ পাঠিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। সেখানে জাতীয় ও রাজ্য সড়ক-সহ প্রধান রাস্তাগুলিতে ই-রিকশা বা টোটোর চলাচল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
পুলিশের অধস্তন আধিকারিকদেরও এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিয়ম ভাঙলে Motor Vehicles Act, 1988-এর আওতায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
অর্থাৎ, কোনও টোটো বা ই-রিকশা নিষিদ্ধ প্রধান সড়কে চলাচল করলে তা আর শুধুমাত্র ট্রাফিক নিয়মভঙ্গ হিসেবে দেখার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
কেন হাইওয়েতে টোটো নিয়ন্ত্রণ?
টোটো ও ই-রিকশার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় যাতায়াতকে সহজ করা। বিশেষ করে পাড়া, বাজার, স্টেশন বা বাড়ির কাছাকাছি জায়গায় যাত্রী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই যানগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক জায়গায় এই ছোট যানগুলি প্রধান সড়ক এবং হাইওয়েতেও চলাচল শুরু করেছে। ফলে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই রাস্তায় চলাচল নিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশাসনের যুক্তি, ব্যস্ত প্রধান সড়কে ধীরগতির যানবাহনের সংখ্যা বাড়লে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
‘লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ই-রিকশার অনুমোদনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা।
সহজ কথায়, কোনও যাত্রী বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন বা প্রধান পরিবহণ কেন্দ্র থেকে নিজের বাড়ি কিংবা স্থানীয় গন্তব্যে পৌঁছতে যাতে সহজে ছোট যান ব্যবহার করতে পারেন, সেই প্রয়োজন মেটাতেই ই-রিকশার ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল।
সেই ব্যবস্থার সঙ্গে হাইওয়েতে দীর্ঘ দূরত্বে চলাচলের বিষয়টি এক নয়। রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্দেশের মূল লক্ষ্যও এই দুই ধরনের ব্যবহারের মধ্যে সীমারেখা স্পষ্ট করা।
২০১৬ সালের নির্দেশিকার প্রসঙ্গ
ই-রিকশার চলাচল নিয়ে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রকের G.S.R. 709(E)-সহ সংশ্লিষ্ট বিধি এবং রাজ্যের ২০১৬ সালের নির্দেশিকার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে।
এই বিধি ও নির্দেশিকার আলোকে কোন ধরনের রাস্তায় ই-রিকশা চলতে পারবে এবং কোথায় বিধিনিষেধ রয়েছে, তা কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তাই নতুন করে রাজ্যের সব রাস্তায় টোটো নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়। বরং নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত প্রধান সড়কে চলাচল বন্ধ করাই এই নির্দেশের কেন্দ্রবিন্দু।
দিলীপ ঘোষ কী বললেন?
পরিবহণ দফতরের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, হাইওয়েতে টোটোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্তাদেরও হাইওয়েতে টোটোর চলাচল বন্ধ করার বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর যুক্তি, প্রধান সড়কে টোটো, সাইকেল এবং ভারী যান একই সঙ্গে চলাচল করলে রাস্তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
অর্থাৎ সরকারের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে সড়ক নিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ।
তাহলে কি গরিব মানুষের রুজি-রোজগার বন্ধ হবে?
টোটো বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। চালকদের পাশাপাশি এই পরিষেবার উপর নির্ভর করেন অসংখ্য যাত্রীও। ফলে হাইওয়েতে নিষেধাজ্ঞার খবর সামনে আসতেই তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
তবে বর্তমান নির্দেশের অর্থ টোটো চালানো বা ই-রিকশা পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করা নয়। স্থানীয় বা অনুমোদিত রাস্তায় নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলাচল করার সুযোগ থাকছে।
তাই চালকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—কোন রাস্তা নিষিদ্ধ এবং কোন রুট অনুমোদিত, তা স্থানীয় প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশের কাছ থেকে পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া।
নিয়ম ভাঙলে কী হতে পারে?
প্রধান সড়ক বা হাইওয়েতে যেখানে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ, সেখানে নির্দেশ অমান্য করলে Motor Vehicles Act, 1988 অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
তাই শুধু যাত্রী পাওয়ার জন্য নিষিদ্ধ প্রধান সড়কে টোটো নিয়ে ওঠা চালকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে, যাত্রীদেরও বোঝা জরুরি যে, কোনও নির্দিষ্ট রুটে টোটো চলতে দেখা গেলেই সেই রুটটি আইনত অনুমোদিত—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পুরো রাজ্যে কি টোটো বন্ধ হচ্ছে?
না।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নির্দেশের মূল বিষয় হল জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট প্রধান রাস্তায় ই-রিকশা বা টোটোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করা।
স্থানীয় ও অনুমোদিত রাস্তায় টোটো চলাচল বন্ধ করার কোনও সর্বাত্মক নির্দেশের কথা এখানে বলা হয়নি।
সামনে কী হতে পারে?
টোটো ও ই-রিকশা যেমন সাধারণ মানুষের সস্তা ও সহজ যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তেমনই ব্যস্ত হাইওয়েতে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—একদিকে দুর্ঘটনা ও যানজট কমানো, অন্যদিকে টোটো চালকদের জীবিকা এবং সাধারণ মানুষের স্থানীয় যাতায়াতের প্রয়োজন অক্ষুণ্ণ রাখা।
এখন নজর থাকবে জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন কীভাবে কোন কোন রুটে এই নির্দেশ কার্যকর করে এবং নিষিদ্ধ রাস্তাগুলির বিষয়ে চালকদের জন্য কতটা স্পষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া হয়, তার দিকে।



