কেরিয়ারের তখন একেবারে সোনালি সময়। একের পর এক সফল ছবি, বলিউডের প্রথম সারির নায়িকাদের মধ্যে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছেন কাজল। ঠিক সেই সময়েই হঠাৎ বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন অভিনেত্রী। পাত্র—তখনকার ‘অন্যরকম’ স্বভাবের অভিনেতা অজয় দেবগণ।
১৯৯৯ সালের সেই সিদ্ধান্ত যে একেবারেই সহজ ছিল না, তা পরে কাজল নিজেই জানিয়েছেন। এমনকি তাঁর বাবা সোমু মুখোপাধ্যায়ও প্রথমে মেয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, এত ভালো সময়ে বিয়ে করলে কাজলের কেরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন অজয়ের হাতই ধরেছিলেন কাজল?
বিয়ের সিদ্ধান্তে বাবা ছিলেন আপত্তি
এক সাক্ষাৎকারে কাজল জানিয়েছিলেন, তিনি যখন বাবাকে নিজের বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানান, তখন সোমু মুখোপাধ্যায় বিষয়টি নিয়ে আপত্তি করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল—কাজল তখন খুবই তরুণী এবং কেরিয়ারও দুর্দান্ত গতিতে এগোচ্ছিল।
কাজলের কথায়, বাবা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত তাড়াতাড়ি কেন বিয়ে করতে চান। এমনকি কিছুদিন তাঁর সঙ্গে কথাও বলেননি। কাজল অবশ্য নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।
অর্থাৎ, বাবার আপত্তির মূল কারণ ছিল অজয়কে পছন্দ না করা নয়, বরং কেরিয়ারের শীর্ষ সময়ে মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ।
পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মা তনুজা
বাবার আপত্তির বিপরীতে কাজল পাশে পেয়েছিলেন তাঁর মা, বর্ষীয়ান অভিনেত্রী তনুজাকে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কাজলের সেই পুরনো বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, তনুজা মেয়েকে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিত হতে বলেছিলেন। কাজল যখন নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকার কথা জানান, তখন মা তাঁকে সমর্থন করেন।
আর কাজল নিজেও পরে জানিয়েছিলেন, তাঁর মা তাঁকে নিজের মনের কথা শুনতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অভিনেত্রী নিজের সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন।
কিন্তু অজয়ের মধ্যে এমন কী দেখেছিলেন কাজল?
এই প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় কাজলের নিজের কথাতেই।
কাজল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিয়ের আগে তিনি মনে করতেন তাঁকে বিয়ে করানোর জন্য যেন কাউকে মাথায় বন্দুক ধরতে হবে! কিন্তু অজয়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর সেই ধারণা বদলে যায়।
অভিনেত্রীর ভাষায়, অজয় তাঁকে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার অনুভূতি দিয়েছিলেন। তিনি অজয়কে ‘grounded’ এবং শক্ত ভিতের মতো একজন মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন। কাজল আরও বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল অজয় তাঁকে ছেড়ে যাবেন না, তিনিও অজয়কে ছেড়ে যেতে চাইবেন না।
অর্থাৎ, শুধু প্রেম নয়—বিশ্বাস, স্থিরতা এবং মানসিক নিরাপত্তা কাজলের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা নিয়েছিল বলে তাঁর নিজের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
প্রথম দেখায় কিন্তু অজয়কে পছন্দই হয়নি কাজলের!
আজকের এই সম্পর্কের গল্প শুনলে অবাক লাগতে পারে। কারণ অজয়কে প্রথম দেখার পর কাজলের ধারণা মোটেই ভালো ছিল না।
১৯৯৫ সালে ‘হলচল’ ছবির সেটে তাঁদের প্রথম পরিচয়। কাজল দেখেছিলেন, অজয় এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন। পরে সেই প্রথম দেখার কথা বলতে গিয়ে কাজল জানিয়েছিলেন, অজয়কে তাঁর বেশ গম্ভীর ও দূরত্ব বজায় রাখা মানুষ মনে হয়েছিল।
এমনকি কাজল মজা করে জানিয়েছিলেন, অজয়ের সঙ্গে দেখা করার মাত্র ১০ মিনিট আগেও তিনি তাঁর সম্পর্কে খারাপ কথা বলছিলেন!
কিন্তু প্রথম ধারণা যে সবসময় শেষ সত্যি হয় না, তাঁদের প্রেমের গল্পই তার প্রমাণ।
বন্ধুত্ব থেকেই ধীরে ধীরে প্রেম
‘হলচল’-এর সেটে কাজ করতে করতেই তাঁদের কথাবার্তা শুরু হয়। দুজনেরই তখন আলাদা সম্পর্ক ছিল। পরে সেই সম্পর্কগুলি ভেঙে যাওয়ার পর কাজল ও অজয়ের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়।
কাজলের কথায়, তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও সিনেমার মতো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ছিল না। ধীরে ধীরে হাত ধরা থেকে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। একসঙ্গে ডিনার, গাড়িতে ঘোরাঘুরি—এইভাবেই তাঁরা একে অপরের কাছাকাছি চলে আসেন।
অজয়ও পরে জানিয়েছিলেন, তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে প্রচলিত ‘আই লাভ ইউ’ বা আনুষ্ঠানিক প্রপোজালের কোনও নাটকীয়তা ছিল না। সময়ের সঙ্গে তাঁরা বুঝেছিলেন, তাঁরা একসঙ্গেই থাকতে চান।
চার বছরের সম্পর্কের পর বিয়ে
পরিচয়ের পর সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে। প্রায় চার বছর একসঙ্গে থাকার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯-এ অজয় দেবগণ ও কাজল বিয়ে করেন।
বিয়েটিও ছিল বেশ ঘরোয়া। অজয়ের মুম্বইয়ের বাড়িতে ঐতিহ্যবাহী রীতিতে তাঁদের বিয়ে হয়। মিডিয়ার অতিরিক্ত নজর এড়াতেই অনুষ্ঠানটি ছোট রাখা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই সময় কাজলের কেরিয়ার যে তুঙ্গে ছিল, সেটি তিনিও পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন। ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কেরিয়ারের শীর্ষে বিয়ে করা তাঁর জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল।
বিয়ের পর কি কেরিয়ার থেমে গিয়েছিল?
কাজলের ক্ষেত্রে উত্তরটা হল—না।
বিয়ের পরও তিনি অভিনয় চালিয়ে যান। বরং পরবর্তী বছরগুলিতেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে কাজ করেছেন। কাজলের নিজের বক্তব্য ছিল, বিয়ে মানেই যে অভিনয় ছেড়ে দিতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।
তাঁর মতে, একজন অভিনেত্রী একই সঙ্গে সংসার ও কেরিয়ার সামলাতে পারেন—যদি নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বাস থাকে এবং জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া যায়।
অজয়ও একাধিক সাক্ষাৎকারে তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে অপরকে নিজের মতো থাকার জায়গা দেওয়ার কথা বলেছেন। ২০১৯ সালে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—কেউ কাউকে এমন কিছু হতে বলেননি, যা তিনি আসলে নন।
তাহলে অজয়কেই কেন?
কাজলের নিজের বক্তব্যগুলি একসঙ্গে রাখলে উত্তরটা বেশ পরিষ্কার।
অজয়ের মধ্যে তিনি এমন একজন মানুষকে দেখেছিলেন, যিনি তাঁর কাছে স্থির, বাস্তববাদী, নির্ভরযোগ্য এবং মানসিকভাবে নিরাপদ বলে মনে হয়েছিল। তাঁদের ব্যক্তিত্ব ছিল একেবারেই আলাদা—কাজল ছিলেন বেশি চঞ্চল ও বহির্মুখী, অজয় তুলনায় শান্ত ও অন্তর্মুখী।
কিন্তু সেই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত তাঁদের সম্পর্কের বাধা হয়নি।
বরং কাজলের বক্তব্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে তাঁরা একে অপরকে বুঝতে শিখেছিলেন এবং সম্পর্কটিকে প্রতিদিন নতুন করে সামলেছেন।
শেষ কথা
১৯৯৯ সালে যখন কাজল বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন অনেকের চোখেই সেটি ছিল কেরিয়ারের শীর্ষ সময়ে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। বাবাও সেই কারণেই আপত্তি করেছিলেন।
কিন্তু কাজল নিজের সিদ্ধান্তে বিশ্বাস রেখেছিলেন। তাঁর কাছে অজয় শুধু একজন সহ-অভিনেতা বা প্রেমিক ছিলেন না—ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন।
২৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাঁদের সম্পর্কের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই—কখনও কখনও কেরিয়ারের সঠিক সময় আর ব্যক্তিগত জীবনের সঠিক সময় এক হয় না। সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির নিজের।



