বাজার থেকে দেখতে একেবারে টাটকা, মসৃণ আলু কিনে আনলেন। কিন্তু রান্নার সময় ছুরি চালাতেই দেখা গেল ভিতরে কালচে বা বাদামি দাগ! কখনও আবার আলু নরম, কখনও অঙ্কুর বেরিয়েছে, আবার কোনও কোনও আলুর গায়ে দেখা যাচ্ছে সবুজ রং।
সমস্যা হল, শুধু বাইরে থেকে দেখে সবসময় বোঝা যায় না আলুটি সত্যিই ভালো কি না।
আলু দীর্ঘদিন আলো, আর্দ্রতা বা অনুপযুক্ত পরিবেশে থাকলে তার গুণমান নষ্ট হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আলুর ভিতরের বাদামি দাগ পচনের কারণে নয়, অন্য শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন বা আঘাতের কারণেও হতে পারে। তাই বাজারে আলু কেনার সময় কয়েকটি বিষয় দেখে নেওয়া জরুরি।
১. আলুর গায়ে সবুজ রং দেখলেই সাবধান
আলুর খোসা সবুজ হয়ে যাওয়া শুধু রঙের পরিবর্তন নয়। আলোতে থাকার কারণে আলুতে chlorophyll তৈরি হওয়ার পাশাপাশি glycoalkaloid, যেমন solanine ও chaconine-এর মাত্রা বাড়তে পারে। বেশি মাত্রায় এগুলি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই বাজারে আলুর গায়ে যদি স্পষ্টভাবে বড় অংশজুড়ে সবুজ রং দেখা যায়, সেই আলু না কেনাই ভালো।
সামান্য সবুজ অংশ থাকলে সেটি গভীরভাবে কেটে বাদ দেওয়ার পরও যদি সবুজভাব বা অস্বাভাবিকতা থেকে যায়, আলুটি ফেলে দেওয়াই নিরাপদ। ব্যাপকভাবে সবুজ হয়ে যাওয়া আলু খাওয়া উচিত নয়।
২. হাতে নিয়ে দেখুন—আলু শক্ত তো?
ভালো আলু সাধারণত শক্ত ও দৃঢ় অনুভূত হয়।
কিন্তু হাতে হালকা চাপ দিলেই যদি আলু অস্বাভাবিক নরম লাগে, চামড়া কুঁচকে যায় অথবা কোথাও নরম পচা অংশ পাওয়া যায়, তাহলে সেটি না কেনাই ভালো।
সংরক্ষণের সময় নরম, কুঁচকে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত আলু দ্রুত নষ্ট হতে পারে। আলু সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও নরম বা কুঁচকে যাওয়া আলু আলাদা করে দ্রুত ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৩. কালো দাগ দেখলেই কি আলু পচা?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়।
আলুর গায়ে ছোটখাটো দাগ বা আঘাতের চিহ্ন থাকলেই সেটিকে পচা বলা যায় না। আলুতে আঘাত, সংরক্ষণজনিত সমস্যা কিংবা বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কারণে ভিতরে বাদামি বা কালচে অংশ দেখা দিতে পারে।
তবে যদি আলুর ভিতরের অংশ নরম, ভেজা, পচা, দুর্গন্ধযুক্ত বা ছত্রাকযুক্ত হয়, তাহলে সেটি খাবেন না।
বিশেষ করে নরম পচা অংশ বা কালো-বাদামি cavity দেখা গেলে সেই আলু বাদ দেওয়াই নিরাপদ।
৪. আলুতে অঙ্কুর বেরিয়েছে—তা হলে কি ফেলে দেবেন?
অঙ্কুর বের হওয়া মানেই আলু পচে গেছে—এমনটা ঠিক নয়।
আলু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে অঙ্কুর বের হতে পারে। তবে বড় বা অতিরিক্ত অঙ্কুর, কুঁচকে যাওয়া, নরম হয়ে যাওয়া এবং সবুজভাব একসঙ্গে থাকলে আলুটি না খাওয়াই নিরাপদ।
অঙ্কুর ও তার আশপাশের অংশে glycoalkaloid-এর মাত্রা বেশি থাকতে পারে। তাই ছোট অঙ্কুর থাকলে তা ভালোভাবে বাদ দিয়ে আলুটি পরীক্ষা করতে হবে; আলু যদি সবুজ, নরম বা অতিরিক্ত অঙ্কুরযুক্ত হয়, পুরো আলুটি ফেলে দেওয়া ভালো।
৫. আলু কাটার পর বাদামি হয়ে গেল কেন?
অনেক সময় ভালো আলু কাটার কয়েক মিনিট পরেই সাদা অংশে বাদামি বা ধূসর-কালচে ছোপ দেখা যায়। এর মানেই কিন্তু আলু পচা নয়।
কাটা আলুর অংশ বাতাসের সংস্পর্শে এলে enzymatic browning বা জারণজনিত রঙ পরিবর্তন হতে পারে। তাই শুধু কাটার পর সামান্য বাদামি হওয়াকে পচনের প্রমাণ হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
তবে এর সঙ্গে যদি দুর্গন্ধ, অস্বাভাবিক নরমভাব, পচা অংশ বা ছত্রাক দেখা যায়, তখন সেই আলু খাবেন না।
৬. বাজারে আলু কেনার সময় ১০ সেকেন্ডের পরীক্ষা
আলু কেনার সময় খুব সহজ একটি চেকলিস্ট মনে রাখতে পারেন—
দেখুন → ধরুন → গন্ধ নিন।
দেখুন: বড় সবুজ অংশ, ছত্রাক, গভীর ক্ষত বা পচা দাগ আছে কি না।
ধরুন: আলু শক্ত কি না। অস্বাভাবিক নরম বা কুঁচকে গেলে এড়িয়ে চলুন।
গন্ধ নিন: পচা বা অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ থাকলে কিনবেন না।
আর একসঙ্গে অনেক আলু কিনলে বাড়ি ফিরে ভালো ও ক্ষতিগ্রস্ত আলু আলাদা করে রাখুন। নরম বা ক্ষতিগ্রস্ত আলু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ না করাই ভালো।
আলু বাড়িতে কীভাবে রাখবেন?
আলু দীর্ঘদিন ভালো রাখতে ঠান্ডা, অন্ধকার ও শুকনো পরিবেশে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আলোতে থাকলে সবুজ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং glycoalkaloid তৈরি হতে পারে।
আলু রাখার জায়গায় নিয়মিত দেখে নিন কোনও একটি আলু নরম বা পচা হয়ে গিয়েছে কি না। একটি নষ্ট আলু অন্য আলুগুলির সংরক্ষণযোগ্যতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
শেষ কথা
বাজারে আলু কেনার সময় শুধু সাইজ বা চকচকে খোসা দেখলেই হবে না। শক্তভাব, সবুজ রং, অঙ্কুর, নরম পচা অংশ এবং অস্বাভাবিক গন্ধ—এই কয়েকটি বিষয় দেখলেই অনেকটাই বোঝা যায় আলুটি কেনার মতো কি না।
আর মনে রাখবেন, সব কালো বা বাদামি দাগ মানেই পচা নয়, আবার সবুজ বা পচা অংশকে রান্না করে নিরাপদ করে নেওয়াও ঠিক নয়। সন্দেহ থাকলে খাবারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি না নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।



