একসময় টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও দেবশ্রী রায়। পর্দার প্রেম একসময় গড়িয়েছিল বাস্তব জীবনেও। কিন্তু যে সম্পর্ক একদিন সাতপাকে বাঁধা পড়েছিল, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সংসারে নেমে আসে বিচ্ছেদের ছায়া।
আজ বহু বছর পরেও তাই যখন কোনও পুরনো তারকা জুটি আবার পর্দায় ফেরে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের মনে প্রশ্ন ওঠে—প্রসেনজিৎ ও দেবশ্রীকে কি আবার একসঙ্গে দেখা যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য অতীতের মতো সরল নয়।
ছোটবেলার পরিচয় থেকে প্রেম
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও দেবশ্রী রায়ের পরিচয় ছিল বহু পুরনো। পরবর্তীতে সেই সম্পর্ক প্রেমে পরিণত হয় এবং ১৯৯২ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। ২০২৬ সালের একটি সাক্ষাৎকারে প্রসেনজিতের বোন পল্লবী চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছেন, পরিবারের অনেকের অজান্তেই সেই বিয়ে হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় দেবশ্রী ছিলেন প্রসেনজিতের থেকেও বড় তারকা।
অর্থাৎ, আপনার স্ক্রিপ্টে থাকা “১ মে ১৯৯৪-এ বিয়ে” তথ্যটি সংশোধন করা প্রয়োজন। প্রকাশ্য একাধিক প্রতিবেদনে বিয়ের বছর ১৯৯২ বলা হয়েছে।
‘পুরুষোত্তম’-এর সময়ও তাঁরা ছিলেন পর্দার জুটি
প্রসেনজিৎ শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, পরিচালক হিসেবেও দেবশ্রীকে নিয়ে কাজ করেছিলেন।
১৯৯২ সালে মুক্তি পায় ‘পুরুষোত্তম’। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছিলেন প্রসেনজিৎ নিজেই এবং অভিনয়ে ছিলেন প্রসেনজিৎ ও দেবশ্রী রায়। ছবিটির মুক্তির তারিখ ছিল ৬ নভেম্বর ১৯৯২।
অর্থাৎ, ছবিটি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সময়কার কাজ হলেও এটিকে শুধু প্রেমের গল্পের অংশ হিসেবে দেখার বদলে টলিউডের সেই সময়ের পেশাগত যাত্রারও অংশ হিসেবে দেখা যায়।
‘উনিশে এপ্রিল’ হয়ে উঠল শেষ অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ছবি
এরপর আসে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উনিশে এপ্রিল’। ১৯৯৪ সালের এই ছবিতে প্রসেনজিৎ ও দেবশ্রী দুজনেই অভিনয় করেছিলেন। ছবিটির জন্য দেবশ্রী জাতীয় পুরস্কারও পান।
তবে তাঁদের দাম্পত্য নিয়ে পরবর্তীকালে নানা ধরনের দাবি, গুঞ্জন এবং ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও পেশাগত প্রতিযোগিতার কথা বলা হয়েছে, কোথাও আবার সংসার ও কাজের ভারসাম্য নিয়ে মতপার্থক্যের কথা সামনে এসেছে। কিন্তু এগুলির সবকটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে লেখা ঠিক হবে না।
নিশ্চিত তথ্য হল—১৯৯৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় এবং এরপর দীর্ঘ সময় তাঁদের আর একসঙ্গে কোনও ছবিতে দেখা যায়নি।
কেন ভেঙেছিল বুম্বা-চুমকির সংসার?
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি জল্পনা।
বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে টলিপাড়ায় নানা কথা শোনা গিয়েছে। দেবশ্রীর অভিনয়, তাঁর কেরিয়ার, দাম্পত্যে মতপার্থক্য—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবি প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
বরং প্রসেনজিতের নিজের কথাতেও বোঝা যায়, সেই বিচ্ছেদ তাঁর জীবনে সহজ অভিজ্ঞতা ছিল না। নিজের আত্মজীবনী এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি সেই সময়ের মানসিক চাপ ও পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।
তাই “অমুক কারণেই তাঁদের সংসার ভেঙেছিল”—এমন সরল সিদ্ধান্তের বদলে বলা যায়, তাঁদের সম্পর্কের ভাঙনের পেছনে একাধিক ব্যক্তিগত ও পেশাগত টানাপোড়েনের কথা পরবর্তীকালে সামনে এসেছে।
বিচ্ছেদের পর আর কেন একসঙ্গে কাজ করেননি?
এটাই সম্ভবত তাঁদের গল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
১৯৯৫ সালের বিচ্ছেদের পর দীর্ঘ সময় প্রসেনজিৎ ও দেবশ্রীকে একই ছবিতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে প্রসেনজিৎ পরবর্তীতে অপর্ণা গুহঠাকুরতাকে বিয়ে করেন এবং সেই সম্পর্কও পরে ভেঙে যায়। বর্তমানে তিনি অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সংসার করছেন।
দেবশ্রীও নিজের আলাদা পথ বেছে নেন।
বছরের পর বছর তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে জনসমক্ষে খুব বেশি কথা হয়নি। এমনকি দেবশ্রীকে প্রসেনজিতের সঙ্গে আবার কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখাননি—এমন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এখানেই গল্পের নতুন মোড়।
‘প্রাক্তন ২’-এ কি ফিরতে পারেন বুম্বা-চুমকি?
কয়েক বছর আগে থেকেই প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীকে ফের একসঙ্গে পর্দায় আনার আলোচনা হয়েছে।
২০২১ সালেই শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের প্রযোজনা সংস্থা/পরিচালক জুটির সঙ্গে প্রসেনজিৎ, দেবশ্রী ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে নিয়ে একটি ছবির সম্ভাবনার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তখন বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি।
আরও সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
প্রসেনজিৎ জানিয়েছেন, তিনি এখন দেবশ্রীর সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। এমনকি ‘প্রাক্তন ২’-তে প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণা ও দেবশ্রীকে একসঙ্গে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেছেন। তবে দেবশ্রীর সম্মতি ও অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে নিশ্চিত ছবি হিসেবে ঘোষণা করা যায় না।
অর্থাৎ, “দেবশ্রী চিরতরে না বলে দিয়েছেন”—এমন দাবি এখন করা ঠিক হবে না।
দেব-শুভশ্রী আর বুম্বা-চুমকির গল্প এক নয়
দেব ও শুভশ্রীর ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিরতির পর ‘ধূমকেতু’-কে ঘিরে তাঁদের পুনর্মিলন দর্শকদের নস্টালজিয়া ফিরিয়েছে।
কিন্তু প্রসেনজিৎ ও দেবশ্রীর ক্ষেত্রে সম্পর্কের সমীকরণ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁরা শুধু দীর্ঘদিনের পর্দার জুটি ছিলেন না, বাস্তব জীবনেও ছিলেন স্বামী-স্ত্রী।
সেই সম্পর্কের বিচ্ছেদ, তারপর প্রায় তিন দশকের পেশাগত দূরত্ব—সব মিলিয়ে তাঁদের আবার একসঙ্গে পর্দায় দেখা নিঃসন্দেহে আলাদা মাত্রার ঘটনা হবে।
তবে শেষ সিদ্ধান্ত শুধুই নস্টালজিয়ার নয়। চিত্রনাট্য, দুই অভিনেতার সম্মতি এবং তাঁদের বর্তমান পেশাগত সিদ্ধান্তই ঠিক করবে বুম্বা-চুমকি আবার একই ফ্রেমে ফিরবেন কি না।
শেষ কথা
একসময় যাঁদের পর্দার রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনও একসময় হয়ে উঠেছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।
আজ তাঁরা দুজনেই নিজেদের জীবনে অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েছেন। তাই পুরনো সম্পর্ককে নতুন করে বিচার করার চেয়ে, যদি সত্যিই কোনওদিন তাঁরা একই ছবিতে ফেরেন, সেই নতুন কাজটিকে তার নিজের যোগ্যতায় দেখা—হয়তো সেটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আর ‘বুম্বা-চুমকি’ কি সত্যিই আবার একই পর্দায় ফিরবেন?
উত্তর এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।



