হঠাৎ করেই একটি খবর ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়েছে—তাহলে কি বাতিল হয়ে যাচ্ছে ১০ টাকার নোট? হাতে থাকা দশ টাকার নোট কি আর বাজারে চলবে না? সামাজিক মাধ্যমে এবং লোকমুখে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাওয়ায় আতঙ্ক বেড়েছে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে। কারণ দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো লেনদেনের ক্ষেত্রে ১০ টাকার নোটই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
কেউ বলছেন নির্দিষ্ট একটি তারিখের পর আর ১০ টাকার নোট গ্রহণ করা হবে না, আবার কেউ দাবি করছেন ব্যাঙ্কে গিয়ে নোট বদলাতে হবে। এমন গুজবের জেরে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে আদৌ কি কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? সত্যিই কি বাতিল হচ্ছে ১০ টাকার নোট?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই উঠে আসছে খুচরো টাকার ভয়াবহ সংকটের বিষয়টি। অটো, টোটো কিংবা রিকশায় উঠলেই যাত্রীরা বুঝে যাচ্ছেন সমস্যার গভীরতা। ১০ টাকার ভাড়ার বদলে ১০০ টাকার নোট দিলে ফেরত পাওয়া খুচরো অনেক সময় কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাতে আসে ছেঁড়া, মাঝখান থেকে জোড়া লাগানো কিংবা একাধিকবার টেপ লাগানো নোট।
অনেক সময় এমন নোটও মিলছে যেগুলি আংশিক পোড়া বা এতটাই জীর্ণ যে দোকানদার নিতে চাইছেন না। এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে বহু ক্ষেত্রেই অটো বা রিকশা চালকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়াতে হচ্ছে যাত্রীদের। চালকদের একটাই বক্তব্য—“খুচরো নেই, যা আছে তাই নিতে হবে। বাজারে দশ টাকার ভালো নোটই মিলছে না।”
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে—তাহলে কি ধীরে ধীরে সমস্ত ১০ টাকার নোট তুলে দেওয়া হচ্ছে? অনেকেই মনে করছেন, হয়তো নতুন কোনও সিদ্ধান্তের আগাম ইঙ্গিত হিসেবেই বাজারে ভালো ১০ টাকার নোটের সরবরাহ কমে গিয়েছে।
বর্তমানে অনেক অটো, টোটো ও রিকশায় ইউপিআই বা স্ক্যানারের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা চালু হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল নয়। সমস্ত যানবাহনে এই ব্যবস্থা নেই। ফলে নগদ টাকার উপর নির্ভরশীল যাত্রীদের প্রতিদিনই সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশেষ করে শহরতলির রুটগুলিতে এই সমস্যা আরও প্রকট। দমদম স্টেশন থেকে নাগেরবাজার কিংবা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলির অটো রুটে প্রতিদিন খুচরো নিয়ে ঝামেলায় পড়ছেন যাত্রীরা। অনেক সময় খুচরো না থাকার অজুহাতে চালকেরা ভাড়া বেশি রেখে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠছে।
অন্যদিকে অটোচালকদেরও নিজস্ব যুক্তি রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, “যাত্রীরা যা দেন, আমরা সেটাই ফেরত দিই। আলাদা করে কোথা থেকে খুচরো আনব? ১০ টাকার ভাড়ায় যদি কেউ ১০০ টাকার নোট দেয়, তা হলে সমস্যা তো হবেই।” তাঁদের দাবি, বাজার থেকেই ভালো ১০ টাকার নোট পাওয়া যাচ্ছে না।
এই পুরো পরিস্থিতির মাঝেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কি সত্যিই ১০ টাকার নোট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত আরবিআই বা কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাবে ১০ টাকার নোট বাতিলের কোনও সিদ্ধান্ত নেই। বর্তমানে প্রচলিত ১০ টাকার নোট সম্পূর্ণ বৈধ এবং বাজারে চলবে বলেই জানা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খুচরো টাকার সংকট মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার ফল। পুরনো ও জীর্ণ নোট দ্রুত বদলানোর প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলার কারণেই বাজারে খারাপ অবস্থার নোট বেশি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন বাড়ায় ছোট নোটের ব্যবহার কিছুটা কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে খুচরোর প্রাপ্যতার উপর।
তবে গুজবে কান দিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই মত অর্থনৈতিক মহলের। যতক্ষণ না আরবিআই কোনও লিখিত নির্দেশ বা বিজ্ঞপ্তি জারি করছে, ততক্ষণ ১০ টাকার নোট বাতিল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
সুতরাং, আপনার কাছে যদি কারি কারি ১০ টাকার নোট থেকেও থাকে, সেগুলি নিয়ে এখনই চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই। নোটগুলি এখনও বৈধ এবং বাজারে ব্যবহারযোগ্য। তবে খুব বেশি ছেঁড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট হলে ব্যাঙ্কে গিয়ে বদলে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ১০ টাকার নোট বাতিলের খবর এই মুহূর্তে নিছকই গুজব। তবে খুচরো সংকট যে বাস্তব সমস্যা, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকারি স্তরে যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও জোর দেওয়া হয়, তাহলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



