পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এবার বড় ধাক্কা খেল তৃণমূল কংগ্রেস। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার টানা জিজ্ঞাসাবাদের পর পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার করা হলো তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং বিধাননগরের প্রভাবশালী নেতা সুজিত বসুকে। সোমবার সিজিও কমপ্লেক্সে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির দফতরে হাজিরা দিতে যাওয়ার পরেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, জেরায় একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা না করায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
রাজ্যের নতুন সরকার গঠনের পর এই গ্রেফতারি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্নে দুর্নীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটায় জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, নতুন সরকারের আমলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কড়া অবস্থান নেওয়া হতে পারে।
সুজিত বসুর বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। দক্ষিণ দমদম পুরসভার প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার সময় নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে আর্থিক লেনদেন এবং প্রভাব খাটানোর একাধিক তথ্য তাদের হাতে এসেছে। গত বছরও তাঁর বাড়িতে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়েছিল বলেও সূত্রের খবর।
সোমবার সকালেই সুজিত বসু সিজিও কমপ্লেক্সে পৌঁছন। এরপর শুরু হয় ম্যারাথন জেরা। তদন্তকারীরা নিয়োগ সংক্রান্ত তালিকা, সুপারিশপত্র, আর্থিক লেনদেন এবং কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেন। ইডির দাবি, একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তাঁর বয়ানে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। সেই কারণেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, সুজিত বসু শুধু প্রাক্তন মন্ত্রীই নন, তৃণমূলের সংগঠনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুখ। বিশেষ করে বিধাননগর ও উত্তর ২৪ পরগনা এলাকায় তাঁর প্রভাব যথেষ্ট। “বিধাননগরের দাদা” হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। ফলে তাঁর গ্রেফতারি যে তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা, তা বলাই যায়।
নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় এর আগেও একাধিক হেভিওয়েট নেতা জড়িয়েছেন। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক—তৃণমূলের বহু প্রথম সারির নেতা তদন্তের মুখে পড়েছেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো সুজিত বসুর নাম। ফলে বিরোধীরা দাবি করছে, দুর্নীতির শিকড় রাজ্যের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যদিও ইডির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, সমস্ত পদক্ষেপই তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে করা হচ্ছে এবং তদন্ত সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া মেনেই এগোচ্ছে।
এই গ্রেফতারির পর রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের টাকা লুট হয়েছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে তৃণমূল বলছে, তদন্তের নামে বিরোধী নেতাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে।
প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করছে, আগামী দিনে এই মামলায় আরও বড় তথ্য সামনে আসতে পারে। কারণ তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই একাধিক নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য খতিয়ে দেখছেন। এছাড়া আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
সব মিলিয়ে সুজিত বসুর গ্রেফতারি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে। নতুন সরকারের আমলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান কতটা জোরদার হবে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। একইসঙ্গে এই মামলার তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং আর কারা তদন্তের আওতায় আসেন, তা নিয়েও জোর চর্চা শুরু হয়েছে।



