সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় কখন কোন বিষয় ভাইরাল হয়ে জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে, তা আগে থেকে আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব। ঠিক তেমনভাবেই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তথাকথিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। প্রথমে এটি শুধুই একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্রচার হিসেবে শুরু হলেও, ধীরে ধীরে সেটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক, সমর্থন, পাল্টা সমালোচনা এবং নতুন জোট-রাজনীতির জল্পনা। আর এবার সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে যাওয়ায়।
সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দু’জনেই “ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করা” এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও গোটা বিষয়টি অনেকের মতে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবেই করা হয়েছে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় তা ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
আসলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি প্রথম সামনে আসে সুপ্রিম কোর্টের এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। এরপর বেকারত্ব, চাকরির সংকট, সামাজিক ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে হাতিয়ার করে একটি অনলাইন প্রচার শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সেই প্রচার লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এর ভিডিও, পোস্ট ও মিম ভাইরাল হতে শুরু করে। অনেকে এটিকে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন, আবার অনেকে এটিকে নিছক ট্রোল রাজনীতি বলেও উড়িয়ে দিয়েছেন।
এই আবহেই আম আদমি পার্টি, সমাজবাদী পার্টির মতো কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কিছু নেতার নাম এই প্রচারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। পরে তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু নেতাও বিষয়টি নিয়ে মজার ছলে মন্তব্য করেন। আর তারপরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে মমতা ও অভিষেকের নাম। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক জোট নয়, বরং কেন্দ্রীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির এক ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ।
ডেরেক ও’ব্রায়েন তাঁর পোস্টে লেখেন যে, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দু’জনেই ন্যায়ের জন্য লড়তে প্রস্তুত।” পাশাপাশি তিনি কৌতুকের সুরে আরও যোগ করেন যে তাঁরা ‘ককরোচ’ প্ল্যাটফর্মের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন। এই মন্তব্য সামনে আসতেই নেটদুনিয়ায় হাস্যরসের বন্যা বয়ে যায়। কেউ এটিকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ বিরোধী ঐক্যের নতুন বার্তা হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গোটা ঘটনাটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা লুকিয়ে রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা ও সামাজিক ক্ষোভের বিষয়গুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত দ্রুত ভাইরাল হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলিও এখন অনলাইন জনমতকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে ব্যঙ্গ, মিম এবং ডিজিটাল প্রচার এখন গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
এদিকে বিরোধী শিবিরে নতুন সমীকরণের জল্পনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ ইতিমধ্যেই সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, তৃণমূলের মহুয়া মৈত্র এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতারা বিভিন্নভাবে এই ভাইরাল প্রচারের প্রসঙ্গ তুলেছেন। ফলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিরোধী শক্তিগুলি সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে হাতিয়ার করেই নতুন জনমত গড়ার চেষ্টা করছে।
যদিও বিজেপি শিবির গোটা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ডকে রাজনৈতিক সমর্থন বলে দেখানো আসলে বিরোধীদের বিভ্রান্তিকর প্রচার। অন্যদিকে তৃণমূলের সমর্থকরা বলছেন, এটি নিছকই একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক বার্তা, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হতাশা তুলে ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন শুধুমাত্র একটি ভাইরাল নাম নয়, বরং ডিজিটাল যুগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বাস্তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল না হলেও, সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি যে এখন সরাসরি জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে, এই ঘটনা যেন আবারও সেটাই প্রমাণ করল। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে যাওয়ার পর সেই বিতর্ক যে আরও কয়েক ধাপ বেড়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য।



