ভারতকে ঘিরে পাকিস্তানের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রশিদ আহমেদের একটি বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। একটি জনসভায় লস্কর-ই-তইবার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বক্তব্য রাখতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সেখানেই ভারতকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন পাকিস্তানের এই প্রাক্তন মন্ত্রী।
ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তা নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের একজন প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন মঞ্চে কীভাবে উপস্থিত হলেন এবং কেন তিনি লস্কর-ই-তইবার প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সইদের প্রশংসা করলেন—তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
লস্কর-ই-তইবার মঞ্চে শেখ রশিদ
সম্প্রতি লস্কর-ই-তইবার একটি জনসভায় শেখ রশিদ আহমেদকে বক্তব্য রাখতে দেখা যায়। তিনি ‘আওয়ামি মুসলিম লিগ’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং পাকিস্তানের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ওই অনুষ্ঠানে লস্কর-ই-তইবার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচিত খালিদ মাসুদ সান্ধু এবং মহম্মদ ইয়াকুব শেখের উপস্থিতির কথাও সামনে এসেছে। ফলে অনুষ্ঠানটির চরিত্র এবং সেখানে একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর উপস্থিতি ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
হাফিজ সইদের প্রশংসা, নিজেকে বললেন ‘গোলাম’
বক্তব্যে শেখ রশিদ হাফিজ সইদের প্রশংসা করেন। হাফিজ সইদ ২০০৮ সালের মুম্বই সন্ত্রাসবাদী হামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।
শেখ রশিদ শুধু তাঁর প্রশংসাই করেননি, নিজেকে ‘হাফিজ সাহেবের গোলাম’ বলেও উল্লেখ করেছেন বলে প্রকাশিত ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে। এই মন্তব্যই রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
কারণ, পাকিস্তানের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে এমন বক্তব্য উঠে আসা নিছক রাজনৈতিক বক্তৃতার সীমা ছাড়িয়ে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলছে।
ভারতকে কী হুমকি দিয়েছেন শেখ রশিদ?
ভারতকে লক্ষ্য করে শেখ রশিদের বক্তব্যের ভাষাও যথেষ্ট আক্রমণাত্মক। তিনি বলেন, ভারত পাকিস্তানের দিকে ‘চোখ তুলে’ তাকালে আল্লাহ ভারতকে ধ্বংস করবেন।
এরপর তিনি এমন মন্তব্য করেন যে ভারতে পাখির ডাক শোনা যাবে না এবং মন্দিরে ঘণ্টাও বাজবে না।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে হুমকির বার্তাই দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে একটি দেশের বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য দেওয়াও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শেখ রশিদ ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইমরান খানের সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ফলে তিনি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
যদিও তিনি বর্তমানে মন্ত্রী নন, তবুও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং অতীত প্রশাসনিক ভূমিকার কারণে এই ধরনের বক্তব্যকে সাধারণ রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
বিশেষ করে যে মঞ্চে লস্কর-ই-তইবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে তাঁর বক্তব্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে অবস্থান সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলতে পারে।
পাকিস্তান কি সন্ত্রাসবাদের ‘শিকার’, নাকি অন্য ছবিও রয়েছে?
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে সন্ত্রাসবাদের অন্যতম ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। দেশটির অভ্যন্তরেও জঙ্গি হামলায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
কিন্তু একই সময়ে পাকিস্তানের মাটিতে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে।
শেখ রশিদের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই পুরনো বিতর্ককেই ফের সামনে নিয়ে এসেছে। একজন প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি এমন মঞ্চে গিয়ে হাফিজ সইদের প্রশংসা করেন, তাহলে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ভারতের বিরুদ্ধে হুমকির প্রভাব কী?
এই ধরনের বক্তব্য ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্ক যখন দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে, তখন কোনও প্রাক্তন উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্য যুদ্ধংদেহী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তবে শেখ রশিদের বক্তব্যকে পাকিস্তান সরকারের সরকারি অবস্থান হিসেবে দেখার আগে ইসলামাবাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানা গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর বক্তব্য এবং বর্তমান সরকারের নীতি—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
ভাইরাল ভিডিও ঘিরে নতুন বিতর্ক
শেখ রশিদের বক্তব্যের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিসর এবং জঙ্গি সংগঠনগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পাকিস্তানের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যদি প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দেন, তাহলে ইসলামাবাদ এর বিরুদ্ধে কী অবস্থান নেয়।
ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকি, হাফিজ সইদের প্রশংসা এবং লস্কর-ই-তইবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি—এই তিনটি বিষয়ই এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে। তবে ভিডিওটির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং অনুষ্ঠানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সামনে এলে ছবিটি আরও স্পষ্ট হবে।



