শরীরের ওজন কমেছে—তাতেও প্রশ্ন, বেড়েছে—তাতেও কটাক্ষ। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া ইন্দ্রাণী হালদারের কাছে তাই নেটমাধ্যমের মন্তব্য শুধু ‘ট্রোলিং’ নয়, হয়ে উঠেছিল মানসিক চাপের আরও একটি কারণ। এবার সেই অভিজ্ঞতার কথাই খোলাখুলি জানালেন অভিনেত্রী।
দীর্ঘ বিরতির পর ফের কাজের জগতে ফিরতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ‘শ্রীময়ী’-খ্যাত ইন্দ্রাণী। তাঁর চেহারায় বড় পরিবর্তন দেখে ফের শুরু হয়েছে নেটমাধ্যমে আলোচনা। কিন্তু সেই চেহারা বদলের পেছনে ছিল দীর্ঘ শারীরিক লড়াই—যা জানলে হয়তো অনেকের মন্তব্য করার আগে একবার ভাবতে ইচ্ছে করবে।
কেন এতটা ওজন বেড়ে গিয়েছিল ইন্দ্রাণীর?
ইন্দ্রাণীর সাম্প্রতিক কথায় জানা যায়, কোমরের চোটের কারণে তাঁকে দীর্ঘ সময় শারীরচর্চা থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য স্টেরয়েড-সহ ওষুধও নিতে হয়েছিল। পরে লিগামেন্টের সমস্যাতেও ভুগেছেন অভিনেত্রী। সব মিলিয়ে প্রায় দু’বছর নিয়মিত ব্যায়াম করা সম্ভব হয়নি।
এই সময় তাঁর ওজন বেড়ে প্রায় ৭৫ কেজিতে পৌঁছয়। ইন্দ্রাণীর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ বা হালকা জিমে যাওয়া দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তিনি নির্দিষ্ট ডায়েট মেনে ফের ফিটনেসে মন দেন।
২০ কেজি ওজন কমানোর পিছনে কী ছিল?
অভিনেত্রী জানিয়েছেন, একসময় তাঁর ওজন প্রায় ২০ কেজি বেড়ে গিয়েছিল। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে ডায়েটের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা শুরু করেন। কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় ২২ কেজি ওজন কমিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ, পর্দায় এখন যে তুলনামূলক রোগা ইন্দ্রাণীকে দেখা যাচ্ছে, সেই পরিবর্তন কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পিছনে ছিল শারীরিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে নিজের পুরনো ছন্দে ফেরার চেষ্টা।
মোটা হওয়ার সময়ও কটাক্ষ, রোগা হওয়ার পরেও কেন?
সমস্যাটা এখানেই। ওজন বেড়ে যাওয়ার সময়ও ইন্দ্রাণীকে নেতিবাচক মন্তব্যের মুখে পড়তে হয়েছিল। তিনি জানিয়েছেন, প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তাঁর চেহারা নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে, পোশাক বদলাতে হয়েছে এবং একসময় নিজের চেহারা নিয়ে আত্মবিশ্বাসও কমে গিয়েছিল।
কিন্তু কঠিন পরিশ্রমে যখন সেই অতিরিক্ত ওজন অনেকটাই কমিয়ে আবার পর্দায় ফেরার প্রস্তুতি নিলেন, তখনও নেটমাধ্যমের একাংশের কটাক্ষ থামেনি।
‘লোকে কী চায়?’—কী বললেন ইন্দ্রাণী?
সম্প্রতি বডি শেমিং প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইন্দ্রাণীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, মানুষের শরীরের পরিবর্তনের পিছনে সবসময় ব্যক্তিগত ইচ্ছা কাজ করে না। অসুস্থতা, চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার কারণেও কারও ওজন বা চেহারায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এই প্রসঙ্গেই অভিনেত্রী প্রশ্ন তোলেন, একজন মানুষ ওজন বাড়ালে তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করা হয়, আবার ওজন কমালেও যদি একইভাবে বিচার করা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশাটা আসলে কী?
তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তীব্র অংশটি ছিল—“লোকে কী চায়, আমি কি ক্যান্সারে মারা যাই?” এই কথার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কারও শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে হাসি-ঠাট্টা বা কটাক্ষ করার আগে তাঁর জীবনের বাস্তব পরিস্থিতিটাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শরীর নিয়ে মন্তব্য করার আগে কী ভাবা উচিত?
ইন্দ্রাণীর অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যার দিকে নজর ফেরায়—বডি শেমিং। কারও ওজন বেশি হলে যেমন তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করা হয়, তেমনই অতিরিক্ত রোগা দেখালেও একইভাবে প্রশ্ন তোলা হয়।
কিন্তু শরীরের আকৃতি কোনও মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। বিশেষ করে অসুস্থতা বা চিকিৎসার সঙ্গে লড়াই করে ফেরা কারও ক্ষেত্রে বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্দ্রাণীর ক্ষেত্রেও তাঁর নিজের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, এই সময়টা নিছক ‘ওজন কমানোর জার্নি’ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল চোট, চিকিৎসা, দীর্ঘ বিরতি এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।
দীর্ঘ বিরতির পর আবার অভিনয়ে ফিরছেন ইন্দ্রাণী
‘শ্রীময়ী’ শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুটা সময় ক্যামেরা থেকে দূরে ছিলেন ইন্দ্রাণী। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি নিজের পছন্দের চরিত্র না পাওয়ার বিষয়টিও তিনি আগে জানিয়েছেন।
২০২৬ সালে ফের নিয়মিতভাবে কাজের দিকে ফিরছেন বলে তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে উঠে এসেছে। অর্থাৎ, এতদিনের বিরতির পর প্রত্যাবর্তনটাই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্দ্রাণীর কথায় বড় বার্তা
একজন শিল্পীকে তাঁর অভিনয়, কাজ ও প্রতিভার জন্য মূল্যায়ন করা হবে, নাকি তাঁর শরীরের মাপ দেখে—প্রশ্নটা শুধু ইন্দ্রাণী হালদারের ক্ষেত্রে নয়। বিনোদন জগতের বহু শিল্পীই বিভিন্ন সময়ে চেহারা নিয়ে সামাজিক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন।
ইন্দ্রাণীর বক্তব্য সেই পুরনো মানসিকতার বিরুদ্ধেই প্রশ্ন তুলেছে। তাঁর ওজন একসময় বাড়েছিল, পরে কমেছে—কিন্তু দু’টি অবস্থার মাঝেই যে মানুষটি ছিলেন, তিনি একই ব্যক্তি।
তাই কারও শরীর দেখে মন্তব্য করার আগে তাঁর জীবনের অদৃশ্য লড়াইটুকুও মনে রাখা জরুরি। ইন্দ্রাণীর দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে আসার গল্পে তাই ওজনের সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।



