৬৭ বছর বয়সেও জিমে নিয়মিত, পর্দায় এখনও শক্তপোক্ত উপস্থিতি—সঞ্জয় দত্তের ফিটনেস নিয়ে কৌতূহল তাই কমে না। কী খান তিনি? কতবার খান? আর এত বছর বয়সেও শরীরচর্চার সঙ্গে এই ডায়েট কীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন?
সম্প্রতি নিজের খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সঞ্জয় দত্ত জানিয়েছেন, তিনি দিনে ছ’বার অল্প অল্প করে খাবার খান, আর তাঁর খাবারের তালিকা শুনলে অনেকের কাছেই সেটি বেশ ‘বোরিং’ মনে হতে পারে। তবে অভিনেতার নিজের কথাতেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই খাবারের পরিমাণ ও সময় তাঁর ওয়ার্কআউটের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করা হয়।
সঞ্জয় দত্তের দিনে কী কী খাওয়া হয়?
অভিনেতার বর্ণনা অনুযায়ী, দিনের শুরুতে তাঁর খাবারের তালিকায় থাকে মুসলি, ডিমের সাদা অংশ এবং অ্যাভোকাডো।
কিছুক্ষণ পর তিনি খান স্যালাড বা ফল। এর পরে থাকে সেদ্ধ মুরগি। অর্থাৎ তাঁর দৈনিক খাদ্যাভ্যাসে বারবার ফিরে আসে প্রোটিন, ফল, সবজি এবং তুলনামূলক সরল খাবার।
তবে তাঁর পছন্দের খাবারের তালিকা কিন্তু একেবারেই অন্যরকম। সঞ্জয় জানিয়েছেন, তিনি চিকেন টিক্কা, ফিশ টিক্কা, কাবাব এবং বিরিয়ানি-ও পছন্দ করেন। তাই তাঁর ডায়েট মানেই সারাক্ষণ সেদ্ধ খাবার আর স্বাদহীন মেনু—এমনটাও ঠিক নয়।
ছ’বার খাওয়ার কারণ কী?
সঞ্জয় দত্তের নিজের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—তিনি ওয়ার্কআউট অনুযায়ী খাবার ঠিক করেন। অর্থাৎ দিনে ছ’বার খাওয়াকে তিনি আলাদা কোনও জাদুকরী ফিটনেস ফর্মুলা হিসেবে তুলে ধরেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে একাধিকবার ছোট মিল কিছু মানুষের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের শারীরিক সক্রিয়তা বেশি, কঠিন ওয়ার্কআউটের রুটিন রয়েছে বা বারবার খিদে পায়, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের meal pattern কাজে লাগতে পারে।
কিন্তু শুধু ছ’বার খাওয়ার কারণেই metabolism বেড়ে যাবে বা ওজন কমে যাবে—এমন প্রমাণ নেই। মোট ক্যালোরি গ্রহণ, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফাইবার এবং খাবারের সামগ্রিক মান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলি, ডিমের সাদা অংশ, অ্যাভোকাডো—কেন এই কম্বিনেশন?
সঞ্জয়ের উল্লেখ করা খাবারগুলির পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্যও বেশ আলাদা।
ডিমের সাদা অংশ ও মুরগি উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস। নিয়মিত শরীরচর্চা করা মানুষের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন পেশি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে অ্যাভোকাডোতে থাকে unsaturated fat, আর মুসলি, ফল ও স্যালাড থেকে পাওয়া যায় কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার এবং বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট।
ফলে তাঁর ডায়েটের বড় বিষয়টি কোনও একটি ‘সুপারফুড’ নয়; বরং প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং উদ্ভিদজাত খাবারের সমন্বয়। বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যাতেও এই ভারসাম্যকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কি বিরিয়ানি-কাবাব একেবারেই খান না?
এখানে রয়েছে মজার ব্যাপার। ফিটনেস সচেতন হলেও সঞ্জয় দত্ত নিজের প্রিয় খাবার থেকে পুরোপুরি দূরে থাকেন না।
তিনি জানিয়েছেন, বিরিয়ানি ও কাবাব তাঁর পছন্দের খাবারের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে চিকেন টিক্কা ও ফিশ টিক্কার প্রতিও তাঁর পছন্দের কথা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ ‘ফিট থাকতে হলে সারাজীবন প্রিয় খাবার ছেড়ে দিতে হবে’—এমন সরল সমীকরণও এখানে দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও হল, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ভারসাম্যপূর্ণ থাকলে মাঝে মাঝে পছন্দের খাবার খাওয়ার জায়গা থাকতে পারে; তবে পরিমাণ ও ঘনত্ব গুরুত্বপূর্ণ।
৬ বার খাওয়া কি সবার জন্য ভালো?
না। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
একজন বলিউড অভিনেতার ওয়ার্কআউট, শরীরের গঠন, কাজের সময়সূচি এবং দৈনিক ক্যালোরির প্রয়োজন একজন সাধারণ অফিসকর্মী বা কম সক্রিয় মানুষের সঙ্গে এক হবে না।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, বয়স, শরীরের গঠন, শারীরিক সক্রিয়তা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য-লক্ষ্যের উপর খাদ্যতালিকা নির্ভর করা উচিত। তাই সঞ্জয় দত্তের ডায়েট হুবহু নকল করলেই একই ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
দিনে বেশি বার খাওয়া কি ওজন কমায়?
অবশ্যই নয়।
দিনে তিনবার খেয়ে কেউ ফিট থাকতে পারেন, আবার কারও ক্ষেত্রে চার-পাঁচটি ছোট মিল বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। মূল বিষয় হল, সারাদিনে মোট কত ক্যালোরি ও পুষ্টি গ্রহণ করছেন এবং সেই খাবারের মান কেমন।
তাই ‘ছ’বার খাবার = দ্রুত ওজন কমানো’—এই সূত্রটি বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
৬৭ বছর বয়সেও ফিট থাকার আসল সূত্র তাহলে কী?
সঞ্জয় দত্তের কথাগুলি একসঙ্গে দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার—তিনি ডায়েটকে আলাদা কোনও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে দেখেন না। তাঁর আগের সাক্ষাৎকারেও তিনি জানিয়েছিলেন, ডায়েট ও ওয়ার্কআউটকে তিনি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ হিসেবেই দেখেন।
অর্থাৎ শুধু একটি খাবার, নির্দিষ্ট সময় বা ছ’বার খাওয়ার অভ্যাস নয়—নিয়মিত শরীরচর্চা, খাদ্যের মান এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই রুটিন মেনে চলাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্জয় দত্তের ডায়েট থেকে কী শেখা যায়?
তাঁর খাবারের তালিকা নকল করার চেয়ে তিনটি বিষয় থেকে সাধারণ মানুষ বেশি উপকার পেতে পারেন।
প্রথমত, খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখা। দ্বিতীয়ত, ফল, সবজি ও অন্যান্য fibre-rich food-এর জায়গা রাখা। তৃতীয়ত, প্রিয় খাবার পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে পরিমাণ ও ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ করা।
এই তিনটি অভ্যাস অনেকের ক্ষেত্রেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। তবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন থাকলে পেশাদার চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
এক নজরে সঞ্জয় দত্তের উল্লেখ করা খাবার
সকালে: মুসলি, ডিমের সাদা অংশ, অ্যাভোকাডো
পরের মিল: স্যালাড বা ফল
পরবর্তী সময়ে: সেদ্ধ মুরগি
পছন্দের খাবার: চিকেন টিক্কা, ফিশ টিক্কা, কাবাব, বিরিয়ানি
খাওয়ার ধরন: দিনে ছ’টি ছোট মিল, ওয়ার্কআউট অনুযায়ী
সবশেষে, সঞ্জয় দত্তের ফিটনেসের গল্প থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত ছ’বার খাওয়া নয়, ধারাবাহিকতা। কারণ ৬৭ বছর বয়সে সক্রিয় থাকা কোনও একদিনের ডায়েট প্ল্যানের ফল নয়। নিয়মিত শরীরচর্চা, উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস এবং নিজের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাত্রা বজায় রাখাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



