সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও তারকার নাম ব্যবহার করে ভুয়ো ভিডিয়ো বানিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার ভিউ পাওয়া এখন আর নিছক ‘কনটেন্ট তৈরি’ বলে পার পাওয়ার বিষয় নয়। বলিউড অভিনেতা গোবিন্দাকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যেই এবার এমন কনটেন্ট নির্মাতাদের কড়া আইনি সতর্কবার্তা দিলেন অভিনেতার আইনজীবীরা।
২৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ওই নোটিসে মিথ্যা, মানহানিকর, বিভ্রান্তিকর বা যাচাইহীন তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে AI-নির্মিত কনটেন্ট, ডিপফেক, পরিবর্তিত ছবি, ভিডিয়ো ও অডিয়োর কথাও। এমনকি ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করার সতর্কতাও রয়েছে।
কেন হঠাৎ আইনি পথে গেলেন গোবিন্দা?
কয়েকদিন ধরে গোবিন্দার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা দাবি ছড়াচ্ছে। তাঁর স্ত্রী সুনীতা আহুজার সঙ্গে সম্পর্ক, বিচ্ছেদের জল্পনা এবং অভিনেত্রী কোমল রানি স্বর্ণকারকে ঘিরে কথিত দ্বিতীয় বিয়ের খবর নতুন করে আলোচনায় আসে।
সুনীতার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও বাড়ে। তবে গোবিন্দার ম্যানেজার শশী সিনহা প্রকাশ্যে সেই দ্বিতীয় বিয়ের দাবিকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গোবিন্দার ফের বিয়ে করার প্রশ্নই নেই।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গোবিন্দার নাম ও ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে একাধিক পোস্ট, ভিডিয়ো এবং অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ায় আইনি পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
নোটিসে কী সতর্কতা দেওয়া হয়েছে?
গোবিন্দার পক্ষ থেকে জারি করা নোটিসে শুধু সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নয়, মিডিয়া প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং প্রকাশকদেরও সতর্ক করা হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর, পরিচিতি বা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়কে ব্যবহার করে মিথ্যা বা বিকৃত কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, আপলোড, সম্প্রচার কিংবা শেয়ার করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে AI দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত ছবি, ভিডিয়ো ও অডিয়ো নিয়েও নোটিসে আপত্তি জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তির মুখ বা কণ্ঠস্বর প্রযুক্তির সাহায্যে বদলে এমন কিছু তৈরি করা, যা দেখে সত্যি বলে মনে হতে পারে—সেটিও এই সতর্কবার্তার আওতায় রয়েছে।
১০০ কোটি টাকা কি এখনই জরিমানা?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। গোবিন্দার বিরুদ্ধে ভুয়ো ভিডিয়ো বানালেই ১০০ কোটি টাকা জরিমানা হয়ে যাবে, এমন কথা বলা হয়নি।
আইনি নোটিসে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি আইনি দাবির সতর্কতা, কোনও আদালতের রায় বা ইতিমধ্যে আরোপ করা জরিমানা নয়।
কোনও নির্দিষ্ট মামলায় বাস্তবে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, সেটি আদালতের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট মামলার তথ্যের উপর নির্ভর করবে।
শুধু ডিপফেক নয়, ‘ফেক নিউজ’-ও নিশানায়
গোবিন্দার আইনি পদক্ষেপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—বিষয়টি শুধু AI বা ডিপফেক ভিডিয়োতে সীমাবদ্ধ নয়।
নোটিসে মিথ্যা, মানহানিকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বানানো বা যাচাই না-করা তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনও কনটেন্ট AI দিয়ে তৈরি না হলেও সেটি যদি ভুয়ো বা মানহানিকর হয়, তবুও আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কোন আইনের কথা বলা হয়েছে?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গোবিন্দার পক্ষ সম্ভাব্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে Bharatiya Nyaya Sanhita, 2023 এবং Information Technology Act, 2000-এর প্রাসঙ্গিক বিধানের উল্লেখ রয়েছে।
মানহানি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ, পরিচয়ের অপব্যবহার এবং সাইবার অপরাধের মতো বিষয়েও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা নোটিসে বলা হয়েছে।
আরও কী ধরনের ব্যবস্থা চাওয়া হতে পারে?
নোটিসে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আরও কিছু কঠোর সতর্কতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতের মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত ব্যবস্থা, সম্পত্তি কেনাবেচায় বিধিনিষেধ, এমনকি পাসপোর্ট সংক্রান্ত পদক্ষেপ চাওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এগুলিকে ইতিমধ্যে কার্যকর হওয়া শাস্তি হিসেবে দেখা যাবে না। এগুলি সম্ভাব্য আইনি প্রতিকারের কথা, যা আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে।
কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ?
তারকাদের মুখ, কণ্ঠস্বর এবং পুরনো ভিডিয়ো ব্যবহার করে AI-নির্মিত বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে কোনও তথ্য সত্যি কি না যাচাই না করেই দর্শকেরা তা বিশ্বাস বা শেয়ার করে ফেলেন।
গোবিন্দার এই পদক্ষেপ তাই শুধু ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয় নয়। এটি ডিজিটাল যুগে কোনও সেলিব্রিটির পরিচয়, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে তার আইনি পরিণতি কী হতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সতর্কবার্তা কোথায়?
সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও তারকাকে নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করার সময় তথ্যের উৎস যাচাই করা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে AI দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিয়োকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা, পুরনো ভিডিয়োকে নতুন ঘটনা হিসেবে চালানো কিংবা কারও কণ্ঠস্বর ও মুখ বিকৃত করে বিভ্রান্তিকর বার্তা তৈরি করা গুরুতর আইনি সমস্যার কারণ হতে পারে।
গোবিন্দার নোটিস সেই জায়গাতেই একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ভিউ বা ভাইরাল হওয়ার জন্য ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে বানানো কনটেন্ট তৈরি করলেই দায় এড়ানো যাবে না।
এই মুহূর্তে ১০০ কোটি টাকার কোনও আদালত-নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ হয়নি; এটি আইনি নোটিসে উত্থাপিত সম্ভাব্য দাবি। তবে নোটিসের কড়া ভাষা থেকে স্পষ্ট, নিজের নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভুয়ো বা কৃত্রিম কনটেন্টের বিরুদ্ধে এবার গোবিন্দা নরম পথে হাঁটতে চাইছেন না।



