Friday, August 28, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাট‘৫০০ টাকা দিতে এত সময় লেগেছিল কেন?’ ভবানীপুরে মমতাকে নিশানা শুভেন্দুর, লক্ষ্মীর...

‘৫০০ টাকা দিতে এত সময় লেগেছিল কেন?’ ভবানীপুরে মমতাকে নিশানা শুভেন্দুর, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম অন্নপূর্ণা

ভবানীপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে ফের তৃণমূল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল আগের সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং বর্তমান সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনা। একইসঙ্গে সিঙ্গুরে টাটা প্রকল্প, নিয়োগ দুর্নীতি এবং সরকারি পরিষেবায় রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেও মমতাকে আক্রমণ করেন তিনি।

শুভেন্দুর দাবি, গত ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাংলার উন্নয়নের বদলে রাজ্যের ক্ষতি করেছে। তবে এগুলি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্য পক্ষের বক্তব্য বা পৃথক সরকারি তথ্য থাকলে তা দিয়েই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ৫০০ টাকা দিতে কত সময় লেগেছিল?’

সভায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু প্রশ্ন করেন, ২০২১ সালে মহিলাদের মাসিক ৫০০ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে এত সময় কেন লেগেছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে লোকসভা নির্বাচনের আগে সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ১০০০ টাকা এবং বিধানসভা নির্বাচনের আগে ১৫০০ টাকা করা হয়।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সঙ্গে অন্নপূর্ণা যোজনার তুলনা টানেন। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের অন্নপূর্ণা প্রকল্প তুলনামূলক দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা কয়েক মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অন্নপূর্ণা যোজনায় কতজন টাকা পেয়েছেন?

শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাসে প্রায় ২৮ লক্ষ মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় ছিলেন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১৯ লক্ষে পৌঁছয়। অগস্টে তা আরও বেড়ে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ হয়েছে বলে তিনি জানান। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সংখ্যাগুলিই প্রকাশিত হয়েছে।

শুভেন্দুর বক্তব্য, তালিকা যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার কারণেই শুরুতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা কম ছিল। পরে যাচাই সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি মহিলাকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।

বিজেপি-সমর্থকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি

অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে যেসব মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে বিজেপির অভিযোগ, তাঁদের এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এর পাশাপাশি আর্থিকভাবে দুর্বল মহিলাদেরও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তিনি জানিয়েছেন। অর্থাৎ, নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যার বিস্তার নয়, সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক বাছাইও করা হবে—এমনই বার্তা দিয়েছেন তিনি।

তবে রাজনৈতিক কারণে সরকারি প্রকল্প থেকে কেউ বঞ্চিত হয়েছেন—এই অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ বা পূর্ণ সরকারি পরিসংখ্যান এই বক্তব্যে প্রকাশ করা হয়নি। তাই বিষয়টি রাজনৈতিক দাবির হিসেবেই দেখা উচিত।

সিঙ্গুর থেকে নিয়োগ দুর্নীতি, একাধিক ইস্যুতে মমতাকে আক্রমণ

ভবানীপুরের সভায় শুধু দুই প্রকল্পের তুলনাতেই থামেননি শুভেন্দু। সিঙ্গুর থেকে টাটা গোষ্ঠী সরে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি তৎকালীন রাজ্য সরকারের শিল্পনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পাশাপাশি নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে পাবলিক সার্ভিস কমিশন, স্কুল সার্ভিস কমিশন, পুলিশ নিয়োগ-সহ বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণের অভিযোগ উঠে আসে। ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের প্রসঙ্গও ফের সামনে আনেন তিনি।

এখানে উল্লেখযোগ্য, নিয়োগ সংক্রান্ত মামলাগুলি নিয়ে আদালতের পৃথক নির্দেশ ও বিচারপ্রক্রিয়া রয়েছে। তাই রাজনৈতিক বক্তৃতায় ওঠা অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সমতুল্য ধরে নেওয়া যাবে না।

অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বিক্ষোভ, কী বললেন শুভেন্দু?

অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষোভ এবং বিক্ষোভের খবর সামনে আসার প্রেক্ষাপটেও বক্তব্য রাখেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, সুবিধাভোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো হয়েছে এবং প্রকৃত দাবিদারদের তালিকাভুক্ত করার কাজ চলছে।

তিনি আরও বলেন, এখনও যদি আরও ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মহিলাকে প্রকল্পের আওতায় আনার প্রয়োজন হয়, সরকার সেই ব্যবস্থাও করতে পারে। অর্থাৎ আগামী দিনে অন্নপূর্ণা যোজনার পরিধি আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তিনি জানিয়েছেন।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম অন্নপূর্ণা—আসল পার্থক্য কোথায়?

দুই প্রকল্পের রাজনৈতিক তুলনা এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ছিল তৃণমূল সরকারের অন্যতম পরিচিত সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প। তার বিপরীতে অন্নপূর্ণা যোজনাকে সামনে রেখে বিজেপি সরকার নিজেদের সামাজিক সুরক্ষা নীতির আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চাইছে।

ফলে এই বিতর্ক শুধু মাসিক ভাতার অঙ্ক নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কারা সুবিধা পাবেন, কীভাবে তালিকা তৈরি হবে, যাচাই কতটা স্বচ্ছ হবে এবং বঞ্চিতদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে—এই প্রশ্নগুলিও।

সাধারণ মহিলাদের কাছে বিতর্কের গুরুত্ব কোথায়?

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকল্পের নাম বা কাঠামো বদলালেও সাধারণ পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটাই—নির্ধারিত সুবিধা সময়মতো হাতে পৌঁছচ্ছে কি না।

বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত সরকারি আর্থিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে যাচাই প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা নাম বাদ পড়া সরাসরি পারিবারিক বাজেটে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অন্নপূর্ণা যোজনার দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি আবেদন, যাচাই এবং টাকা পৌঁছনোর ব্যবস্থাও কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই আগামী দিনে বড় পরীক্ষার জায়গা।

রাজনৈতিক আক্রমণের পর সামনে এখন কোন প্রশ্ন?

ভবানীপুরের সভায় শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে পরিষ্কার, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম অন্নপূর্ণা যোজনা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। একদিকে আগের সরকারের প্রকল্পের সময়সীমা ও ভাতা বৃদ্ধিকে আক্রমণ করছেন তিনি, অন্যদিকে বর্তমান সরকারের প্রকল্প দ্রুত সম্প্রসারণের পরিসংখ্যান সামনে রাখছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি হবে রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়—যোগ্য ব্যক্তিরা কত দ্রুত, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং নিয়মিতভাবে তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন, সেটিই। অন্নপূর্ণা যোজনার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বাস্তব ফলাফলই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments