পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে নাতির জন্য দুধ গরম করার ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তা এবার পৌঁছে গেল রাজ্যের শীর্ষ রাজনৈতিক মহলে। ফুটপাতবাসী সীতাদেবীকে আর ফুটপাতে থাকতে হবে না—তাঁদের জন্য স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার সল্টলেকে আয়োজিত ‘জনতার দরবারে’ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনাটির শুরু পার্ক স্ট্রিটে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানে। সেখানে শিশুর জন্য স্টোভে দুধ গরম করতে দেখা গিয়েছিল সীতাদেবীকে। সেই সময় পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি ভিডিও সামনে আসতেই ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। পরে বিষয়টি রাজনৈতিক তরজার কেন্দ্রে চলে আসে।
‘আর ফুটপাতে থাকতে হবে না’, কী বললেন শুভেন্দু?
মঙ্গলবার সীতাদেবী নাতিকে সঙ্গে নিয়ে বরানগরের বিধায়ক সজল ঘোষের মাধ্যমে ‘জনতার দরবারে’ পৌঁছন। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাঁদের আর ফুটপাতে বসবাস করতে হবে না। পুরসভাকে দ্রুত একটি স্থায়ী মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
এই ঘোষণা সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এতদিনের ফুটপাতবাসী পরিবারের জন্য কি এবার সত্যিই একটি স্থায়ী ঠিকানা তৈরি হতে চলেছে?
কারণ পার্ক স্ট্রিটের ঘটনাটি শুধু একটি উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে বিতর্কে আটকে থাকেনি। এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে শহরের গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন এবং প্রশাসনের মানবিক ভূমিকার প্রশ্নও।
এর আগেই মমতার বার্তা
ঘটনাটি নিয়ে তৃণমূলের তরফেও প্রতিক্রিয়া এসেছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সীতাদেবীর পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং তাঁদের আশ্রয় ও নাতির পড়াশোনার বিষয়ে সাহায্যের কথা জানান।
ফলে একটি মানবিক ঘটনা দ্রুতই রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কেন্দ্রে চলে আসে। কার সরকার বেশি মানবিক, কে আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে এবং কার উদ্যোগে পরিবারটির স্থায়ী সমাধান হবে—এই প্রশ্নগুলিই এখন রাজনৈতিক আলোচনায় সামনে।
মমতার বক্তব্যের জবাবে শুভেন্দুর কটাক্ষ
মমতার উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, পরিবারটিকে যদি সত্যিই সাহায্য করতে হয়, তাহলে দলীয় কর্মীর বাড়িতে রাখার বদলে স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা উচিত।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আগের সরকারের ভূমিকা নিয়েও আক্রমণ শানান। শুভেন্দুর অভিযোগ, বহু বছর ধরে শহরের ফুটপাতবাসী মানুষের সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন ঘটনাটি সামনে আসার পর রাজনৈতিক প্রচারের জন্য বিষয়টি ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে এগুলি রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ। এগুলির সত্যতা যাচাই করতে প্রশাসনিক নথি এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত সরকারি পরিসংখ্যানের প্রয়োজন রয়েছে।
অগ্নিমিত্রা পালের সাফাই কী?
পার্ক স্ট্রিটের মূল ঘটনার কেন্দ্রে থাকা পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, শিশুর মুখের খাবার কেড়ে নেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি মূলত ফুটপাতের মতো সংকীর্ণ জায়গায় স্টোভ জ্বালিয়ে রান্না বা আগুন ব্যবহারের বিপদের কথা বলেছেন। তাঁর যুক্তি, পথচারীদের চলাচলের জায়গায় আগুন জ্বালালে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, তাই তিনি তা বন্ধ করতে বলেছিলেন।
কিন্তু ঘটনাটি যেভাবে ভিডিও হয়ে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তাতে প্রশাসনিক নির্দেশের পাশাপাশি আচরণের ধরন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সেই বিতর্কের রেশ এখনও কাটেনি।
বিতর্কের আসল প্রশ্ন: উচ্ছেদের পর কোথায় যাবেন ফুটপাতবাসীরা?
পার্ক স্ট্রিটের ঘটনা আসলে কলকাতার ফুটপাত দখল সমস্যার একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
একদিকে, ফুটপাত পথচারীদের জন্য খোলা রাখা দরকার। অন্যদিকে, ফুটপাতেই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা পরিবারগুলিকে সরিয়ে দিলে তাঁদের পরবর্তী ঠিকানা কী হবে—এই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ বা অসুস্থ সদস্য থাকা পরিবারগুলির ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র উচ্ছেদ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না; বিকল্প আশ্রয় ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে একটি পরিবার
সীতাদেবীর পরিবারের জন্য পাকা ছাদের আশ্বাস নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একইসঙ্গে এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনীতির পরিধিও ক্রমশ বাড়ছে।
মমতার সহমর্মিতার বার্তা, শুভেন্দুর পাল্টা আশ্বাস এবং অগ্নিমিত্রার আত্মপক্ষসমর্থন—তিনটি আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান এখন একই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।
তাই প্রশ্ন শুধু কে কাকে আক্রমণ করলেন, তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—সীতাদেবী ও তাঁর পরিবারের জন্য স্থায়ী বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে?
প্রতিশ্রুতির পর এবার নজর বাস্তবায়নে
রাজনৈতিক বক্তব্যের পর এবার নজর প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে। পুরসভার তরফে সত্যিই কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কোথায় পরিবারটিকে পুনর্বাসন দেওয়া হবে এবং তা কবে বাস্তবায়িত হবে—এই তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কারণ ফুটপাতের উনুনে শিশুর দুধ গরম করার দৃশ্যটি একটি দিনের বিতর্ক তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পর যদি একটি পরিবার সত্যিই স্থায়ী আশ্রয় পায়, তাহলে সেটিই হতে পারে এই বিতর্কের সবচেয়ে বাস্তব ফল।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতির লড়াইয়ে কে জিতল, তা ইতিহাস ঠিক করবে। কিন্তু সীতাদেবীর পরিবারের কাছে আসল জয় হবে একটি নিরাপদ, স্থায়ী ছাদ পাওয়া।



