২০০৫ সালে একই সময়ে রিয়্যালিটি শোয়ের মঞ্চে উঠে এসেছিলেন দুই তরুণ গায়ক। একজন জিতেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান আইডল’, অন্যজন ‘ফেম গুরুকুল’-এ শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারেননি।
প্রথমজন অভিজিৎ সাওয়ান্ত। দ্বিতীয়জন অরিজিৎ সিং।
একজন তখনই হয়ে উঠেছিলেন ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ। আর অন্যজনকে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই দশক পর সেই পুরনো গল্পের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুই গায়কের কেরিয়ার একেবারে ভিন্ন পথে এগিয়েছে।
আর সম্প্রতি অরিজিৎ সিংয়ের সাফল্য নিয়ে অভিজিৎ সাওয়ান্তের একটি মন্তব্য নতুন করে সেই তুলনাই সামনে এনেছে।
অভিজিতের বক্তব্য অনুযায়ী, অরিজিতের উত্থানে পরিশ্রমের পাশাপাশি সঠিক সময়ে সঠিক গান পাওয়ার ‘লাক’ বা ভাগ্যেরও বড় ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ‘তুম হি হো’ গানটি যে কোনও গায়কের কেরিয়ার বদলে দিতে পারত বলেই তাঁর মত।
তাহলে কি সত্যিই অরিজিৎ সিংয়ের সুপারস্টার হয়ে ওঠা শুধু ভাগ্যের গল্প? নাকি ‘লাক’ আসলে বহু বছরের প্রস্তুতির পর পাওয়া একটি সুযোগ মাত্র?
২০০৫-এ কে কোথায় ছিলেন?
২০০৫ সালে অভিজিৎ সাওয়ান্ত ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর প্রথম সিজনের বিজয়ী হন। সেই সময় তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি জাতীয় স্তরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ জানিয়েছেন, বিজয়ী হিসেবে তিনি ₹১ কোটি পুরস্কার এবং Sony-র সঙ্গে অ্যালবাম ডিল পেয়েছিলেন।
তবে এখানে একটি তথ্যগত বিষয় মনে রাখা জরুরি—পুরনো বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রথম ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর পুরস্কারের অঙ্ক নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। তাই ₹১ কোটি সংখ্যাটি অভিজিৎ সাওয়ান্তের সাম্প্রতিক বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করাই নিরাপদ।
অন্যদিকে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ‘ফেম গুরুকুল’-এ অংশ নিয়েছিলেন অরিজিৎ সিং। তিনি সেই শো জিততে পারেননি; ষষ্ঠ স্থানে শেষ করেছিলেন। বিজয়ী হয়েছিলেন কাজি তৌকির ও রূপরেখা বন্দ্যোপাধ্যায়।
অর্থাৎ ২০০৫-এর সমীকরণে অভিজিৎ ছিলেন আলোয়, অরিজিৎ তখনও অপেক্ষারত।
অরিজিৎ কি সত্যিই ১০ বছর ‘উধাও’ ছিলেন?
অভিজিৎ সাওয়ান্তের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই ‘১০ বছর’-এর কথাটিই বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
তিনি বলেছেন, ২০০৫-এর পর অরিজিৎ দীর্ঘ সময় মূলধারার লাইমলাইটের বাইরে থেকে বিভিন্ন মিউজিক স্টুডিয়োতে কাজ করেছেন। বড় বড় মিউজিক কম্পোজারের সঙ্গে প্রডিউসার ও প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করার কথাও জানিয়েছেন অভিজিৎ। তাঁর মতে, সেই সময় অরিজিৎ কার্যত আবার শূন্য থেকে নিজের পথ তৈরি করছিলেন।
এটা আসলে অরিজিতের কেরিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কারণ রিয়্যালিটি শোয়ের মঞ্চে পরিচিতি পাওয়া আর একজন সফল playback singer হয়ে ওঠা—দুটি এক জিনিস নয়।
অরিজিতের সামনে তাই ছিল আরও একটি দীর্ঘ পথ।
Fame Gurukul-এর পরেও থামেননি অরিজিৎ
‘ফেম গুরুকুল’-এর পর অরিজিৎ আরও একটি মিউজিক রিয়্যালিটি শো ‘10 Ke 10 Le Gaye Dil’-এ অংশ নেন এবং সেটিতে সাফল্য পান।
সেই সময় তিনি নিজের স্টুডিয়ো তৈরির জন্য পুরস্কারের অর্থ ব্যবহার করেছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে ‘ফেম গুরুকুল’-এর সময়ই তাঁর প্রতিভা নজরে পড়েছিল সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর। ‘সাওয়ারিয়া’-র জন্য অরিজিতের একটি গান রেকর্ডও হয়েছিল, যদিও তাঁর সেই version শেষ পর্যন্ত ছবিতে ব্যবহার করা হয়নি।
অর্থাৎ বড় সুযোগের দরজা তাঁর সামনে এসেছিল, কিন্তু সব দরজা সঙ্গে সঙ্গে খোলেনি।
২০১১—প্রথম বড় playback সুযোগ
এখানে আপনার মূল স্ক্রিপ্টের একটি তথ্য সংশোধন করা জরুরি।
অরিজিতের ‘মার্ডার ২’ গান ছিল ‘ফির মোহাব্বত’, ‘দিল সামাল যা জারা’ নয়। ২০১১ সালে এই গান দিয়েই তাঁর playback career-এর গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়।
এরপর আসে ‘Raabta’, ‘Phir Le Aaya Dil’-এর মতো গান।
কিন্তু তখনও অরিজিৎ সেই সর্বভারতীয় সুপারস্টার নন, যাঁকে আজকের শ্রোতারা চেনেন।
তারপর আসে ২০১৩।
‘Tum Hi Ho’—যে গান বদলে দিল সবকিছু
‘আশিকি ২’-এর ‘Tum Hi Ho’ অরিজিৎ সিংয়ের কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
গানটি বিপুল জনপ্রিয় হয় এবং অরিজিতের কণ্ঠ রাতারাতি কোটি শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়। Hindustan Times-ও তাঁর কেরিয়ার নিয়ে ফিরে তাকিয়ে লিখেছিল, ‘Tum Hi Ho’-এর পরই তিনি overnight sensation হয়ে ওঠেন।
আর ঠিক এই জায়গাতেই অভিজিৎ সাওয়ান্তের ‘লাক’-এর মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাঁর মতে, ‘Tum Hi Ho’ যে কোনও গায়কের হাতে গেলে তাঁর কেরিয়ার বদলে যেতে পারত। অর্থাৎ গানটি পাওয়ার মুহূর্তটিকেই তিনি অরিজিতের সাফল্যে destiny বা ভাগ্যের একটি বড় উপাদান হিসেবে দেখছেন।
তাহলে অরিজিতের সাফল্য—ভাগ্য, না পরিশ্রম?
এই প্রশ্নের একক উত্তর সম্ভবত নেই।
একজন গায়ককে একটি অসাধারণ গান সুযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু সেই গান পাওয়ার আগের বছরগুলোর প্রস্তুতিও উপেক্ষা করা যায় না।
অরিজিতের ক্ষেত্রে ২০০৫-এর পরের সময়টায় স্টুডিয়োতে কাজ, programming ও production-এর অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন composer-এর সঙ্গে কাজ করা, reality show-এর পর বারবার চেষ্টা—এসবই তাঁর সংগীতজগতের ভিত শক্ত করেছিল বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তাই ‘লাক’ থাকলেই যে সাফল্য নিশ্চিত, এমন প্রমাণ নেই।
বরং অরিজিতের গল্প থেকে এমন একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়—দীর্ঘ প্রস্তুতির পর যখন বড় সুযোগ আসে, তখন সেটিকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
আর অভিজিৎ সাওয়ান্তের গল্প?
২০০৫ সালে অভিজিৎ যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
নিজের সাম্প্রতিক কথাতেই তিনি বলেছেন, সেই সময় অরিজিতের তুলনায় তাঁর জনপ্রিয়তা অনেক বেশি ছিল। ফলে দুজনের উপর চাপও ছিল আলাদা। অভিজিতের সামনে ছিল দ্রুত পাওয়া খ্যাতিকে ধরে রাখার প্রত্যাশা, আর অরিজিতের সামনে ছিল মূলধারায় নিজের জায়গা তৈরি করার দীর্ঘ লড়াই।
অভিজিৎ নিজেও অবশ্য তাঁর বক্তব্যে অরিজিতের পরিশ্রমকে অস্বীকার করেননি। বরং বলেছেন, অরিজিৎ সেই দীর্ঘ সময় প্রচুর কাজ করেছিলেন এবং বহু মিউজিশিয়ানের সঙ্গে কাজ করার পর তাঁর বড় সুযোগ আসে।
আর এখানেই এই গল্পের আসল শিক্ষা।
একই মঞ্চ থেকে শুরু, কিন্তু গন্তব্য আলাদা
২০০৫ সালে একজন ছিলেন রিয়্যালিটি শোয়ের বিজয়ী, অন্যজন ছিলেন ষষ্ঠ স্থানে শেষ করা ১৮ বছরের তরুণ।
কিন্তু ২০২৬-এ এসে সেই সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
একজনের কাছে ২০০৫-এর সাফল্য ছিল কেরিয়ারের বড় সূচনা। অন্যজনের কাছে ২০০৫ ছিল দীর্ঘ যাত্রার প্রথম ধাপ।
তাই অরিজিৎ সিংয়ের সাফল্যকে শুধু ‘ভাগ্যের জোর’ বলে ব্যাখ্যা করা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই একটি গান বা একটি সুযোগের গুরুত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করাও ঠিক নয়।
‘Tum Hi Ho’ হয়তো দরজা খুলেছিল। কিন্তু সেই দরজার সামনে পৌঁছতে অরিজিতের বহু বছরের পথচলা ছিল।
আর অভিজিৎ সাওয়ান্তের সাম্প্রতিক মন্তব্য আসলে সেই পুরনো প্রশ্নটাই নতুন করে তুলেছে—সাফল্যে ভাগ্যের ভূমিকা কতটা, আর প্রস্তুতির ভূমিকা কতটা?



