আশির দশকের শুরু। একদিকে ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের অন্যতম পরিচিত মুখ সন্দীপ পাতিল, অন্যদিকে বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। ক্রিকেটের মাঠের তারকা আর রূপালি পর্দার নায়িকার এই জুটি সেই সময়ে সংবাদমাধ্যমের প্রবল আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে।
তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে এমনও জল্পনা ছড়িয়েছিল যে, পাতিলের দাম্পত্য ভাঙনের নেপথ্যে ছিলেন দেবশ্রী। কিন্তু এই গল্পের সবটাই কি সত্যি? নাকি তার বড় অংশই ছিল সেই সময়ের সিনেমা ও ক্রিকেটজগতের গসিপ?
আজ এত বছর পর ফিরে দেখা যাক সেই বহুচর্চিত সম্পর্কের গল্প।
‘কভি আজনবি থে’-এর সেটেই পরিচয়
১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর ভারতীয় ক্রিকেটারদের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সেই সময়েই সন্দীপ পাতিল অভিনয়ের জগতে পা রাখেন বিজয় সিং পরিচালিত ‘কভি আজনবি থে’ ছবির মাধ্যমে।
ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুনম ধিলন এবং দেবশ্রী রায়। ছবিটির শুটিং শুরু হয় ১৯৮৩ সালে এবং মুক্তি পায় ১৯৮৫ সালের ১ মার্চ। দেবশ্রী অভিনয় করেছিলেন ‘গীতা’ চরিত্রে।
ছবির একটি গান—‘Geet Mere Hothon Ko De Gaya Koi’—এ সন্দীপ ও দেবশ্রীর রসায়নও সেই সময়ে যথেষ্ট আলোচিত হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে খবর প্রকাশিত হতে শুরু করে।
তখন কি সত্যিই প্রেমের সম্পর্ক ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে নিশ্চিতভাবে দেওয়া কঠিন।
পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। তবে দেবশ্রী নিজে সেই সময় দাবি করেছিলেন, সন্দীপ পাতিল তাঁর ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছু নন। এমনকি ১৯৮৩ সালে Stardust পত্রিকায় তাঁকে পাতিলের স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা একটি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তিনি আইনি পদক্ষেপও নিয়েছিলেন।
অর্থাৎ, বাইরে যতই সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হোক, দেবশ্রীর নিজের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি সংযত।
সন্দীপ পাতিল তখন বিবাহিত ছিলেন
এই গল্পের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলির একটি ছিল এটিই।
বিভিন্ন জীবনী ও সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, দেবশ্রীর সঙ্গে পরিচয়ের সময় সন্দীপ পাতিল বিবাহিত ছিলেন। তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সেই সময় থেকেই নানা জল্পনা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ পাতিলের প্রথম দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে এই সম্পর্ককে যুক্ত করে।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—জল্পনা থাকা আর কোনও ঘটনার কারণ প্রমাণিত হওয়া এক জিনিস নয়।
পাতিলের প্রথম বিবাহবিচ্ছেদের একমাত্র বা নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেবশ্রীকে দায়ী করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
‘টাইম পাস’ ছিলেন দেবশ্রী? এই দাবির প্রমাণ কোথায়?
সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া ও বিনোদনমূলক কনটেন্টে এই সম্পর্ককে কখনও কখনও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে দেবশ্রী নাকি সন্দীপ পাতিলের কাছে শুধুই ‘টাইম পাস’ ছিলেন।
কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক সূত্র পাওয়া যায় না।
বরং যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যাচ্ছে—দেবশ্রী নিজেই সম্পর্কটিকে প্রেম হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি। আর ১৯৮৫ সালে ‘কভি আজনবি থে’ মুক্তির পর তাঁদের সম্পর্কের ইতি ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর দু’জনেই এই বিচ্ছেদ নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত আলোচনা করেননি।
তাই ‘টাইম পাস’ শব্দটি সন্দীপ পাতিলের নিজের বক্তব্য হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
তাহলে সম্পর্ক ভাঙল কেন?
এখানেও নিশ্চিত উত্তর নেই।
বিশ্বস্ত সূত্রে তাঁদের বিচ্ছেদের কোনও একক কারণ স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৮৫ সালের পর দু’জনের পথ আলাদা হয়ে যায়—এটুকু বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়।
এরপর দেবশ্রী বাংলা সিনেমায় নিজের ক্যারিয়ারকে আরও শক্তিশালী করেন। ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’, ‘উত্তরলিপি’, ‘অর্পণ’, ‘শঙ্খচূড়’, ‘সুরের সাথী’সহ একাধিক ছবিতে তিনি অভিনয় করেন এবং আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন।
অর্থাৎ, সন্দীপ পাতিলের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর দেবশ্রীর অভিনয়জীবন থেমে গিয়েছিল—এমন দাবি তথ্যের সঙ্গে মেলে না।
বলিউড কেরিয়ার কি সত্যিই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল?
এই দাবিটিও সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে।
‘কভি আজনবি থে’ বক্স অফিসে সফল হয়নি। ছবিটি শুরুতে ভালো দর্শক পেলেও শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
কিন্তু তার জন্য দেবশ্রীর বলিউড কেরিয়ার ‘নষ্ট’ হয়ে গিয়েছিল—এমন সরাসরি প্রমাণ নেই।
বরং তাঁর হিন্দি ছবির তালিকায় ‘Bura Aadmi’, ‘Justice Chaudhury’, ‘Phulwari’, ‘Kabhie Ajnabi The’, ‘Seepeeyan’ এবং ‘Pyar Ka Sawan’-এর মতো কাজ রয়েছে। একই সময়ে বাংলা সিনেমাতেও তাঁর ক্যারিয়ার দ্রুত এগোচ্ছিল।
তাই বলা যায়, বলিউডে তিনি যে ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারেননি, তার কারণ হিসেবে শুধুমাত্র সন্দীপ পাতিলের সঙ্গে সম্পর্ককে দায়ী করার ভিত্তি নেই।
প্রেমের গল্পের শেষ কোথায়?
‘কভি আজনবি থে’ মুক্তির পরই সন্দীপ পাতিল ও দেবশ্রীর সম্পর্ক নিয়ে অধ্যায়টি কার্যত শেষ হয়ে যায় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
দু’জনেই পরবর্তীকালে নিজেদের জীবনে এগিয়ে যান। পাতিল পরে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। দেবশ্রীও পরবর্তী সময়ে নিজের অভিনয় ও নৃত্যজীবনে মন দেন। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন; সেই বিবাহও পরবর্তীতে বিচ্ছেদে শেষ হয়।
তবে সন্দীপ পাতিলের সঙ্গে সম্পর্কের অধ্যায় নিয়ে দেবশ্রী দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলেননি।
তাহলে সত্যিটা কী?
দেবশ্রী রায় ও সন্দীপ পাতিলের সম্পর্ক আশির দশকের অন্যতম আলোচিত ক্রিকেট-বলিউড সম্পর্কের গল্প—এ নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া সব গল্পকে একই মাত্রায় সত্য বলে ধরা যায় না।
যা জানা যায়:
- ১৯৮৩ সালে ‘কভি আজনবি থে’-এর সূত্রে তাঁদের পরিচয় হয়।
- পাতিল তখন বিবাহিত ছিলেন।
- তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ব্যাপক সংবাদ ও জল্পনা হয়েছিল।
- দেবশ্রী প্রকাশ্যে সম্পর্কটিকে প্রেম হিসেবে স্বীকার করেননি এবং নিজেকে পাতিলের বন্ধু বলেছিলেন।
- ১৯৮৫ সালের পর তাঁদের সম্পর্কের ইতি ঘটে বলে সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
- দেবশ্রীর প্রথম দাম্পত্য ভাঙন বা তাঁর পরবর্তী ক্যারিয়ারের জন্য এই সম্পর্ককে সরাসরি দায়ী করার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
শেষ পর্যন্ত এই গল্পের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়তো এখানেই—দু’জনের মধ্যে ঠিক কী সম্পর্ক ছিল এবং কেন তা ভেঙে গেল, তার সম্পূর্ণ উত্তর তাঁরা নিজেরাই প্রকাশ্যে দেননি।
তাই কয়েক দশক পরেও এই অধ্যায় ঘিরে জল্পনা রয়ে গেছে, কিন্তু জল্পনাকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না।



