‘মহালয়া’—বাঙালির কাছে এই একটি শব্দের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ভোরের আকাশ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী, পিতৃপুরুষকে স্মরণ আর মা দুর্গার আগমনের অপেক্ষা।
কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, ‘মহালয়া’ শব্দের অর্থ আসলে কী?
কেন পিতৃপক্ষের শেষ অমাবস্যাকেই মহালয়া বলা হয়? কেন এই দিনকে ঘিরে একদিকে হয় পিতৃপুরুষের তর্পণ, অন্যদিকে শুরু হয় দেবীকে বরণ করার প্রস্তুতি?
আর ২০২৬ সালে কবে সেই বহু প্রতীক্ষিত মহালয়া? কবে করবেন পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ?
জেনে নিন মহালয়ার তারিখ, অর্থ, পৌরাণিক তাৎপর্য এবং প্রচলিত রীতির পুরো গল্প।
‘মহালয়া’ শব্দের অর্থ কী?
‘মহালয়া’ শব্দটি সাধারণভাবে সংস্কৃত ‘মহা’ এবং ‘আলয়’—এই দুই শব্দের সমন্বয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ‘মহা’ অর্থ মহান এবং ‘আলয়’ অর্থ আবাস, আশ্রয় বা নিবাস। সেই অর্থে মহালয়াকে ‘মহান আলয়’ বা ‘মহান নিবাস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। দেবী দুর্গার আগমনের সঙ্গে যুক্ত বাংলা সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যায় এটিকে দেবীর মহান আবাস বা আগমনের সূচনার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
‘মহালয়া’ শব্দের অর্থ শুধু ‘মা দুর্গার ঘরে আসা’—এমন সরল অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। সংস্কৃত অভিধানগত ব্যবহারে ‘মহালয়’ শব্দের সঙ্গে পিতৃপক্ষ ও পিতৃপুরুষের প্রসঙ্গও যুক্ত হয়েছে। তাই মহালয়ার সঙ্গে পিতৃতর্পণ এবং দেবীর আগমন—দুই সাংস্কৃতিক স্তরই জড়িয়ে রয়েছে।
২০২৬ সালে মহালয়া কবে?
২০২৬ সালে মহালয়া পালিত হবে শনিবার, ১০ অক্টোবর।
এই দিনটি একই সঙ্গে সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা Sarva Pitru Amavasya। ২০২৬ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী অমাবস্যা তিথি ৯ অক্টোবর রাতে শুরু হয়ে ১০ অক্টোবর রাত পর্যন্ত থাকবে; তাই ১০ অক্টোবরই মহালয়া ও সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালিত হচ্ছে।
অর্থাৎ ২০২৬ সালে মহালয়ার দিন—
১০ অক্টোবর, শনিবার।
মহালয়ার দিনই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ মহালয়া মূলত পিতৃপক্ষের শেষ পর্বের সঙ্গে যুক্ত।
পিতৃপক্ষের বিভিন্ন তিথিতে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ, তর্পণ ও অন্যান্য আচার পালনের প্রচলন রয়েছে। আর যাঁদের মৃত্যুতিথি জানা নেই, তাঁদের জন্যও সর্বপিতৃ অমাবস্যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বহু ধর্মীয় পরম্পরায় ধরা হয়।
তাই মহালয়া শুধু দুর্গাপুজোর আগমনী নয়—পিতৃপুরুষকে স্মরণ করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
মহালয়ার দিন পিতৃ তর্পণ কেন করা হয়?
হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল ও তিল নিবেদন করে তাঁদের স্মরণ করার রীতিকে তর্পণ বলা হয়।
বাঙালি সংস্কৃতিতে মহালয়ার ভোরে গঙ্গা বা অন্য পবিত্র জলাশয়ে গিয়ে তর্পণ করার দৃশ্য তাই অত্যন্ত পরিচিত।
তবে কারও পরিবারের নির্দিষ্ট শ্রাদ্ধরীতি থাকলে সেই রীতিই অনুসরণ করা উচিত। তর্পণের পদ্ধতি অঞ্চল, পরিবার এবং পঞ্জিকা অনুসারে আলাদা হতে পারে।
২০২৬ সালে ১০ অক্টোবর সর্বপিতৃ অমাবস্যা, তাই এই দিনটি পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ ও তর্পণের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে দেবীপক্ষের সূচনা কবে?
এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা।
বাঙালির সাংস্কৃতিক পরম্পরায় মহালয়াকেই দেবীপক্ষের সূচনা এবং দুর্গাপুজোর আগমনী পর্বের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পঞ্জিকার দিক থেকে মহালয়া হল অমাবস্যা; তার পরের দিন শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুরু হয় পরবর্তী পক্ষ। ২০২৬ সালে কলকাতার পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতিপদ শুরু হচ্ছে ১০ অক্টোবর রাতের পর, অর্থাৎ ১১ অক্টোবর থেকে নবরাত্রির আচার শুরু হয়।
আর বাঙালির শারদীয় দুর্গাপুজোর মূল আচার শুরু হবে আরও পরে।
২০২৬ সালের বঙ্গীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী মহাষষ্ঠীর বোধন ১৬ অক্টোবর, সপ্তমী ১৭ অক্টোবর, অষ্টমী ১৯ অক্টোবর, নবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর।
অর্থাৎ—
মহালয়া — ১০ অক্টোবর
ষষ্ঠীর বোধন — ১৬ অক্টোবর
সপ্তমী — ১৭ অক্টোবর
মহাষ্টমী — ১৯ অক্টোবর
মহানবমী — ২০ অক্টোবর
বিজয়া দশমী — ২১ অক্টোবর
তাই ‘মহালয়ার পাঁচ দিন পর থেকেই মূল পুজো’ বলা পুরোপুরি ঠিক নয়। ২০২৬ সালে মহালয়া থেকে ষষ্ঠীর বোধনের ব্যবধান ছয় দিন।
মা দুর্গা কি সত্যিই মহালয়ার দিন কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসেন?
বাঙালির লোকাচার ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এমন বিশ্বাস অত্যন্ত জনপ্রিয় যে, মহালয়ার পর মা দুর্গা কৈলাস থেকে তাঁর মর্ত্যের পিতৃগৃহে আসার জন্য রওনা হন।
এই কারণেই মহালয়া বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একটি তিথি নয়—‘মায়ের আগমনী’র প্রতীক।
তবে এটি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত। একে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বলা ঠিক নয়।
মহালয়াকে ঘিরে কর্ণের কাহিনিও কেন শোনা যায়?
পিতৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত একটি বহুল প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে মহাভারতের কর্ণকে ঘিরে।
কাহিনি অনুযায়ী, দানবীর কর্ণ জীবনে প্রচুর সোনা, সম্পদ ও অন্যান্য জিনিস দান করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর পিতৃলোকে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে পর্যাপ্ত অন্ন ও জল দান করা হয়নি।
এরপর তাঁকে পৃথিবীতে ফিরে এসে নির্দিষ্ট সময় ধরে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন-জল দানের সুযোগ দেওয়া হয়—এমন একটি কাহিনি পরবর্তী পিতৃপক্ষের ব্যাখ্যায় প্রচলিত হয়েছে। এই কাহিনিকে পিতৃশ্রাদ্ধের গুরুত্ব বোঝানোর একটি পৌরাণিক আখ্যান হিসেবে বলা হয়।
তবে এই কর্ণকাহিনিকে মহালয়া শব্দের ঐতিহাসিক উৎপত্তির প্রমাণ হিসেবে ধরা উচিত নয়। এটি পিতৃপক্ষের মাহাত্ম্য বোঝানোর ধর্মীয় কাহিনি।
মহালয়ার দিন কী কী করা উচিত?
পরিবারের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এই দিনে—
- পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা যায়।
- তর্পণ বা শ্রাদ্ধের আচার পালন করা যায়।
- তিল ও জল দিয়ে পিতৃপুরুষকে তর্পণের প্রচলন রয়েছে।
- দান-ধ্যান ও ধর্মীয় কাজে অংশ নেওয়া হয়।
- দুর্গাপুজোর আগমনী প্রস্তুতি শুরু হয়।
তবে তর্পণের নির্দিষ্ট মন্ত্র, পদ্ধতি ও সময় নিয়ে অঞ্চল ও পরিবারভেদে পার্থক্য রয়েছে। তাই যাঁরা নিয়ম মেনে তর্পণ করবেন, তাঁরা স্থানীয় পুরোহিত বা পরিবারের প্রচলিত আচার অনুসরণ করাই ভালো।
মহালয়ার দিন কী কী করা যাবে না?
এখানেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো অনেক ‘নিষেধ’-এর ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার।
মহালয়ার দিন সবার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে চুল, দাড়ি বা নখ কাটা নিষিদ্ধ, কিংবা প্রত্যেক মানুষকে নিরামিষ খাবারই খেতে হবে—এমন একক, সর্বজনীন বিধান বলা ঠিক নয়।
কিছু পরিবার ও আঞ্চলিক ধর্মীয় পরম্পরায় পিতৃপক্ষ বা শ্রাদ্ধের দিন নিরামিষ আহার, সংযম এবং কিছু নির্দিষ্ট আচরণ পালন করা হয়। আবার পরিবারভেদে রীতিও আলাদা।
একইভাবে মহালয়ার দিন কোনও নতুন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা যাবে না—এটিও সর্বত্র একইভাবে প্রযোজ্য এমন নিয়ম নয়।
অর্থাৎ ধর্মীয় বিশ্বাসকে ‘সর্বজনীন শাস্ত্রবিধি’ হিসেবে না বলে পারিবারিক ও আঞ্চলিক রীতি হিসেবে উপস্থাপন করাই বেশি সঠিক।
মহালয়া আসলে দুই আবেগের মিলন
একদিকে পিতৃপক্ষের সমাপ্তি—পূর্বপুরুষকে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও তর্পণ।
অন্যদিকে দেবীর আগমনের অপেক্ষা—শিউলি ফুলের গন্ধ, কাশফুল, ঢাকের শব্দ আর দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি।
এই দুই আবেগের সন্ধিক্ষণেই বাঙালির কাছে মহালয়ার এত বড় সাংস্কৃতিক গুরুত্ব।
তাই মহালয়া শুধু ‘দুর্গাপুজো শুরুর দিন’ নয়। এটি একই সঙ্গে পিতৃস্মরণ, ধর্মীয় আচার এবং দেবীর আগমনী আবেগের এক অনন্য সংযোগ।



