দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু উৎসবের আগে কলকাতার দুই পরিচিত পুজোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। একদিকে দেশপ্রিয় পার্ক, অন্যদিকে টালা প্রত্যয়—দুই পুজোকেই ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক চাপের আলোচনা সামনে এসেছে।
তবে এই মুহূর্তে দুই পুজোই স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এমন কোনও নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্য নেই। ফলে অভিযোগ, পুজো কমিটির বক্তব্য এবং প্রশাসনের অবস্থান—তিনটি দিক আলাদা করে দেখা জরুরি।
দেশপ্রিয় পার্কের পুজো ঘিরে কী ঘটেছে?
দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গাপুজো কলকাতার অন্যতম পরিচিত পুজো। ২০১৫ সালে তাদের বিশাল প্রতিমা দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। সেই সময় বিপুল ভিড়ের কারণে দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনকে পুজোর দর্শন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
সেই ঘটনার পর বড় পুজোর ক্ষেত্রে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল।
এবার ফের দেশপ্রিয় পার্কের পুজোকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নির্মীয়মাণ মণ্ডপ ভাঙচুরের অভিযোগ
পুজো কমিটির তরফে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, এ বছর দেশপ্রিয় পার্কে প্রায় ৭০ ফুট উচ্চতার একটি মণ্ডপ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। মণ্ডপটির ভাবনা ছিল একটি কাল্পনিক বৌদ্ধ বিহারের আদলে।
পুজো কমিটির অভিযোগ, ৯ আগস্ট রাতে কয়েকজন ব্যক্তি নির্মীয়মাণ মণ্ডপে ঢুকে সেটি ভেঙে দেন। তাঁদের দাবি, সংখ্যায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন ছিল ওই দলটি।
১২ আগস্ট রাতে পুজো কমিটির লেটারহেডে এই ঘটনার কথা জানানো হয়। তবে কারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত এবং কেন নির্মীয়মাণ কাঠামো ভাঙা হল—তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পুলিশ কি আগে থেকে কিছু জানত?
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুজো কমিটির অভিযোগ অনুযায়ী, রাতের ওই ঘটনার বিষয়ে প্রশাসনের তরফে আগে থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার সঙ্গে কারা যুক্ত, তা নির্ধারণের জন্য পুলিশের তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক হামলা হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
টালা প্রত্যয়ের পুজো নিয়েও বিতর্ক
উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী টালা প্রত্যয়ের দুর্গাপুজোকেও ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা বিতর্ক। শতবর্ষের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই পুজোর আয়োজন নিয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের মধ্যে টানাপোড়েনের খবর সামনে এসেছে।
মণ্ডপ বা পুজোর কাঠামো নিয়ে কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়ে থাকলে তার আইনি ভিত্তি, অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কী ছিল—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নাম এই বিতর্কে উঠে এলেও, তাঁদের নির্দেশেই পুজো ভাঙা হয়েছে—এমন অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ সামনে না আসা পর্যন্ত সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বড় পুজো মানেই কি যানজটের আশঙ্কা?
কলকাতায় বড় পুজো মানেই বিপুল দর্শনার্থীর সমাগম। দেশপ্রিয় পার্ক, টালা প্রত্যয় বা অন্য কোনও জনপ্রিয় পুজোর ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হতে পারেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাস্তার ধারণক্ষমতা, পার্কিংয়ের সমস্যা, গণপরিবহণের চাপ এবং পথচারীদের নিরাপত্তা। ফলে বড় পুজোর অনুমতি দেওয়ার আগে ট্রাফিক ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৫ সালের দেশপ্রিয় পার্কের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, আগাম প্রস্তুতি যথেষ্ট না হলে একটি পুজোর ভিড় কীভাবে গোটা এলাকার যান চলাচলকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রশাসনের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ কোথায়?
বড় পুজো বন্ধ করে দেওয়া সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে না। আবার পুজোর কারণে যদি সাধারণ মানুষের চলাচল সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়, সেক্ষেত্রেও প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাই প্রয়োজন হতে পারে নির্দিষ্ট দর্শনার্থী প্রবেশপথ, ব্যারিকেড, পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন, জরুরি যান চলাচলের জন্য পৃথক ব্যবস্থা এবং আগাম ট্রাফিক ডাইভারশন পরিকল্পনা।
বিশেষ করে পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ক্লাব, পুলিশ, পুরসভা ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে সমন্বয় থাকলে শেষ মুহূর্তের অস্থিরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
‘পুজো বন্ধের রাজনীতি’ নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত?
এই প্রশ্নটিই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। বিরোধী পক্ষ যদি ঘটনাগুলিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বলে দাবি করে, তাহলে প্রশাসনের কাছে তার প্রমাণ চাওয়া স্বাভাবিক।
অন্যদিকে, কোনও পুজো কমিটি যদি অনুমতি, নিরাপত্তা, কাঠামোগত ঝুঁকি বা যান চলাচলের নিয়ম ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে প্রশাসনেরও আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
তাই কোনও ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক দাদাগিরি’ বা ‘সুশাসন’—এই দুই চরম ব্যাখ্যার একটিতে পৌঁছে দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সামনে আসা জরুরি।
পুজোর আগে নজরে কলকাতার দুই বড় আয়োজন
দেশপ্রিয় পার্কে মণ্ডপ ভাঙার অভিযোগ এবং টালা প্রত্যয়ের পুজো নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক—দুটি ঘটনাই কলকাতার দুর্গাপুজোর আগে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
একদিকে ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলির স্বাধীনভাবে আয়োজন করার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের নিরাপত্তা ও শহরের স্বাভাবিক যান চলাচলও প্রশাসনের দায়িত্ব।
শেষ পর্যন্ত এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু কয়েকটি ক্লাবের অনুষ্ঠান নয়—এটি শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম বড় অংশ। আর সেই উৎসবকে ঘিরে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক যুক্তিই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।



