শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব কি শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, নাকি প্রশাসনের একের পর এক কাজ সামলানো? জনগণনার কাজে শিক্ষকদের ব্যবহার নিয়ে একটি মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের প্রশ্নে ফের সামনে এল সেই পুরনো বিতর্ক। আদালতের পর্যবেক্ষণ, স্কুলের নির্দিষ্ট সময়সূচির মধ্যে শিক্ষকদের দিয়ে দূরের এলাকায় জনগণনার কাজ করানো হলে পড়াশোনার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
এই প্রশ্ন শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্কুলে শিক্ষকসংখ্যা, ক্লাসের ধারাবাহিকতা এবং পড়ুয়াদের শিক্ষার অধিকার। ফলে আদালতের মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—সরকারি বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে শিক্ষকদের কতটা ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত?
‘স্কুল করবেন, না সেন্সাস করবেন?’
জনগণনার কাজে শিক্ষকদের গণহারে যুক্ত করার নির্দেশ নিয়ে শুনানির সময় কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্যের কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
আদালতের যুক্তি, স্কুল সাধারণত বিকেল পর্যন্ত চলে। তার মধ্যে শিক্ষককে যদি স্কুল থেকে দূরে গিয়ে জনগণনার মতো অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাহলে তাঁর নিয়মিত শিক্ষাদানের কাজে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা থাকেই।
বিশেষ করে যে স্কুলগুলিতে শিক্ষক সংখ্যা এমনিতেই কম, সেখানে একাধিক শিক্ষককে একসঙ্গে অন্য কাজে পাঠানো হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
শুধু জনগণনা নয়, রয়েছে একাধিক প্রশাসনিক দায়িত্ব
শিক্ষকদের অশিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব, বিভিন্ন সরকারি সমীক্ষা এবং মিড-ডে মিলের মতো কাজেও শিক্ষকদের যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষকদের বক্তব্য, এই ধরনের দায়িত্ব একেবারে বন্ধ করা সম্ভব না হলেও বারবার একই শিক্ষককে অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজে যুক্ত করলে তাঁর মূল দায়িত্ব—পড়ানো—ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আর সমস্যাটি বেশি প্রকট হয় ছোট স্কুলগুলিতে। যেখানে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষককে দিয়েই একাধিক শ্রেণির পড়াশোনা চালাতে হয়, সেখানে একজন শিক্ষকও দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো শিক্ষাব্যবস্থায়।
পড়ুয়াদের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
শিক্ষকের অনুপস্থিতি সরাসরি ক্লাসের সময় কমিয়ে দিতে পারে। নিয়মিত শিক্ষক না থাকলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে এমন পড়ুয়াদের উপর, যাদের স্কুলের বাইরের অতিরিক্ত শিক্ষার সুযোগ সীমিত। ক্লাসে নির্দিষ্ট সময়ে সিলেবাস শেষ করা, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং দুর্বল পড়ুয়াদের আলাদা করে সময় দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই শিক্ষক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের কারণে কতটা শিক্ষাদান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করতে স্কুলভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন। তাই বিষয়টি নিয়ে নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব তথ্য সংগ্রহও জরুরি।
জনগণনার কাজ কি শিক্ষকদের দিয়ে করানো যাবে না?
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। জনগণনা একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজ। তাই কোনও না কোনও সরকারি কর্মীকেই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সমস্যা হচ্ছে, কোন কর্মীকে কীভাবে এবং কতদিনের জন্য এই কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। শিক্ষকদের একসঙ্গে বিপুল সংখ্যায় কাজে পাঠালে যদি স্কুলের স্বাভাবিক পঠনপাঠন ব্যাহত হয়, তাহলে প্রশাসনিক প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষার প্রয়োজনের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্ন উঠবেই।
এই জায়গাতেই আদালতের পর্যবেক্ষণ তাৎপর্যপূর্ণ।
রোটেশনে দায়িত্ব ভাগ করার প্রস্তাব
শুনানিতে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে। একসঙ্গে একটি স্কুলের সমস্ত বা অধিকাংশ শিক্ষককে বাইরে না পাঠিয়ে সীমিত সংখ্যক শিক্ষককে রোটেশনের ভিত্তিতে জনগণনার কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
যেমন, কোনও স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলে তাঁদের মধ্যে পাঁচ-ছয়জনকে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারি কাজও চলবে, আবার স্কুলের নিয়মিত পঠনপাঠনও পুরোপুরি থমকে যাবে না।
তবে এই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট স্কুলের শিক্ষকসংখ্যা, কাজের পরিমাণ এবং জনগণনা সংক্রান্ত সরকারি প্রয়োজনের উপর।
রাজ্যের কাছে জবাব চেয়েছে আদালত
শিক্ষকদের জনগণনার কাজে ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের অবস্থান জানতে চেয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। পরবর্তী শুনানি মঙ্গলবার হওয়ার কথা।
এখন মূল নজর থাকবে রাজ্য সরকার আদালতে কী ব্যাখ্যা দেয় এবং শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে স্কুলের পঠনপাঠন কীভাবে সামঞ্জস্য রাখা যায়, সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার দিকে।
আসল প্রশ্ন: শিক্ষকের মূল কাজ কতটা সুরক্ষিত?
সরকারি কাজে শিক্ষকদের সাময়িকভাবে যুক্ত করার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সেই দায়িত্ব যদি নিয়মিতভাবে তাঁদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থার উপর পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
তাই বিতর্কটি শুধু ‘শিক্ষকদের জনগণনার কাজে পাঠানো হবে কি না’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। বৃহত্তর প্রশ্ন হল, প্রশাসনিক কাজের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে স্কুলের পঠনপাঠন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই ভারসাম্য কীভাবে তৈরি করবে সরকার?
হাইকোর্টের প্রশ্ন সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই আবার সামনে এনে দিয়েছে। এখন রাজ্যের জবাব এবং পরবর্তী শুনানির দিকেই নজর শিক্ষামহলের।



