দুর্গাপুজোয় মায়ের প্রতিমার দিকে তাকালে অনেকেরই চোখে পড়ে একটি বিশেষ দৃশ্য—দেবী দুর্গার মাথার ঠিক উপরে চালচিত্রে রয়েছেন মহাদেব শিব। কৈলাস ছেড়ে উমা যখন সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আসেন, তখন তাঁর স্বামী শিবকেও কেন দেখা যায় এই ছবিতে? এর পিছনে কি শুধুই পৌরাণিক কাহিনি, নাকি রয়েছে বাংলার নিজস্ব শিল্প-ঐতিহ্যের ছাপ?
আসলে, দুর্গাপ্রতিমার পিছনের চালচিত্র কেবল সাজসজ্জার অংশ নয়। বাংলার পটচিত্রের ঐতিহ্য, দেবদেবীর পৌরাণিক আখ্যান এবং আঞ্চলিক ধর্মীয় ভাবনা—সব মিলিয়েই এই শিল্পরূপের বিকাশ ঘটেছে।
চালচিত্র কী? দুর্গাপ্রতিমার পিছনে কেন থাকে?
চালচিত্র হল দুর্গাপ্রতিমার পিছনে থাকা অর্ধবৃত্তাকার বা খিলানসদৃশ চিত্রিত পট। ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোয় এই অংশে শিব, নন্দী এবং রাম-সীতা-সহ বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি আঁকা হতে পারে। কোন দেবতার ছবি থাকবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট শিল্পরীতি ও পুজোর ঐতিহ্যের উপর।
বাংলার পটচিত্রশিল্পের সঙ্গে চালচিত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একসময় শিল্পীরা দেবদেবীর কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং লোকজ ভাবনাকে এই পটের মাধ্যমে তুলে ধরতেন। ফলে চালচিত্রকে শুধু প্রতিমার পটভূমি হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না।
দুর্গার মাথার ওপর শিব কেন থাকেন?
এর কোনও একটিমাত্র সর্বজনস্বীকৃত ব্যাখ্যা নেই। তবে শাক্ত ও শৈব ধর্মীয় দর্শনে শিব ও শক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক, আর শিবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে অনেক ধর্মীয় ব্যাখ্যায় চেতনা ও শক্তির অবিচ্ছেদ্য বন্ধন হিসেবে দেখা হয়।
এই ভাবনার আলোকে চালচিত্রে শিবের উপস্থিতিকে দুর্গার সঙ্গে তাঁর চিরন্তন সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে শিবকে ঠিক মাথার ওপরেই রাখার জন্য কোনও একটি নির্দিষ্ট পৌরাণিক কারণ রয়েছে—এমন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট পুজোর নিজস্ব রীতি ও শিল্প-ঐতিহ্য বিবেচনা করা জরুরি।
ঐতিহ্যবাহী চালচিত্রে বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি একসঙ্গে স্থান পায়। তাই সেখানে শিবের অবস্থান ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি বাংলার প্রচলিত প্রতিমা নির্মাণশৈলীরও অংশ।
কৈলাসে থাকলেও উমার সঙ্গে শিবের সম্পর্ক কীভাবে ফুটে ওঠে?
বাংলার দুর্গাপুজোয় উমাকে অনেক সময় বাপের বাড়িতে আসা মেয়ে হিসেবে কল্পনা করা হয়। এই পারিবারিক আবহই বাংলার দুর্গোৎসবকে বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিচয় দিয়েছে। দেবী দুর্গা এখানে শুধু অসুরদলনী নন, তিনি পরিবারের সদস্য—মা, মেয়ে এবং সন্তানদের ঘিরে থাকা এক পরিচিত আবেগের প্রতীক।
এই প্রেক্ষাপটে চালচিত্রে শিবের উপস্থিতিকে উমার পারিবারিক ও পৌরাণিক পরিচয়ের একটি শিল্পিত প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। তবে “কৈলাসে থেকেও শিব সর্বদা দুর্গার মাথার ওপর অবস্থান করেন”—এটি ধর্মীয় প্রতীকী ব্যাখ্যা, আক্ষরিক পৌরাণিক ঘটনা নয়।
চালচিত্রের গুরুত্ব শুধু পৌরাণিক কাহিনিতে নয়
চালচিত্রের বিশেষত্ব হল, এর মাধ্যমে শিল্পীরা একটি ছবির মধ্যেই বহু কাহিনি ও বিশ্বাসকে তুলে ধরতে পারেন। কোথাও শিবের উপস্থিতি, কোথাও অন্য দেবদেবীর ছবি, আবার কোথাও আঞ্চলিক শিল্পরীতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি সমৃদ্ধ চিত্রভাষা।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপুজোর প্রতিমা ও পটচিত্রের রীতিতে পার্থক্য রয়েছে। তাই সব প্রতিমার চালচিত্রে একই ধরনের ছবি বা একই ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে, এমন নয়।
শিব ও দুর্গার এই যুগল উপস্থিতির তাৎপর্য কী?
অনেক ভক্তের কাছে শিব ও দুর্গার একসঙ্গে উপস্থিতি শিব-শক্তির ঐক্য, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং চিরন্তন সম্পর্কের প্রতীক। অন্যদিকে, শিল্প-ইতিহাসের দৃষ্টিতে চালচিত্র বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র ও প্রতিমাশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সুতরাং, দুর্গাপ্রতিমার মাথার ওপর শিবকে দেখার মধ্যে পৌরাণিক বিশ্বাস যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বাংলার শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ছাপ। চালচিত্রের সৌন্দর্য ঠিক এখানেই—একটি চিত্রের মধ্যেই ধর্মীয় ভাবনা, লোকশিল্প এবং বাঙালির দুর্গোৎসবের আবেগ একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়।



