পুলিশি হেফাজতে এক তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহর। নিহত বিরজু কেওটের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কনভয় এলাকায় পৌঁছতেই একদল মানুষ স্লোগান দিতে শুরু করেন। গাড়ি লক্ষ্য করে কাদা, জল এবং জুতো ছোড়ারও অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ এই বিক্ষোভ। অন্যদিকে তৃণমূলের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়কে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হয়েছে।
কেন হালিশহরে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
পুলিশি হেফাজতে বিরজু কেওটের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতেই হালিশহরের বীজপুর এলাকায় গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রবিবার সেখানে তাঁর কনভয় পৌঁছতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একাংশকে তৃণমূল নেত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। অভিযোগ, তাঁর গাড়ির দিকে কাদা, জল এবং জুতোও ছোড়া হয়।
ঘটনার সময় তৃণমূলের একাধিক নেতাও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। বিক্ষোভের জেরে এলাকায় সাময়িকভাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
কোথা থেকে শুরু এই বিতর্ক?
পুরো ঘটনার সূত্রপাত বিরজু কেওটের গ্রেফতার এবং পরবর্তী মৃত্যুকে ঘিরে।
তথ্য অনুযায়ী, কাঁচরাপাড়ার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওটের স্বামী বিরজু কেওটকে হালিশহর থানার পুলিশ তোলাবাজি-সহ একাধিক অভিযোগে গ্রেফতার করে। তাঁকে ব্যারাকপুর আদালতে পেশ করা হলে আদালত পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়।
এর পরেই শনিবার সকালে থানায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা যায়।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি
বিরজু কেওটের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশি নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। পরিবারের দাবি, মারধরের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন থাকার কথাও তাঁরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, পুলিশের তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, অসুস্থতার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
অর্থাৎ, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এই মুহূর্তে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত বা ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত তথ্য সামনে না আসা পর্যন্ত কোনও পক্ষের অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মমতার কনভয় ঘিরে কী ঘটেছিল?
নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময়ই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
‘চোর’ এবং ‘ডাকাতরানি’—এই ধরনের স্লোগান ওঠার কথাও সামনে এসেছে। পাশাপাশি কনভয়ের দিকে কাদা, জল ও জুতো ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার ভিডিও ও বিভিন্ন দৃশ্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিক্ষোভে ঠিক কারা যুক্ত ছিলেন এবং ঘটনার নেপথ্যে কোনও সংগঠিত পরিকল্পনা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ কী?
ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, পরিকল্পিতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পুলিশি হেফাজতে বিরজু কেওটের মৃত্যুর তদন্তের প্রসঙ্গেও তিনি সরব হন। ঘটনার দায় নিয়ে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের পদত্যাগের দাবিও তোলেন তিনি।
তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনও সামনে নেই।
বিক্ষোভের পর কী বললেন মমতা?
প্রবল উত্তেজনার মধ্যেও নিহত বিরজু কেওটের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
পরবর্তীতে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিক্ষোভের নিন্দা করেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে এবং বাংলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর কনভয়ের গাড়িতেও হামলার চিহ্ন রয়েছে।
এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা
ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক বিক্ষোভ—দুই ঘটনাকে ঘিরেই এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
এখন মূল নজর মৃত্যুর তদন্ত এবং মমতার কনভয় ঘিরে বিক্ষোভের ঘটনায় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে।
সামনে বড় প্রশ্ন—মৃত্যুর আসল কারণ কী?
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও বিরজু কেওটের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। পরিবারের তরফে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও পুলিশ তা অস্বীকার করেছে।
ফলে ময়নাতদন্ত, তদন্তের ফলাফল এবং প্রয়োজনীয় সরকারি রিপোর্ট সামনে আসার পরেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয় ঘিরে বিক্ষোভটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, নাকি এর পিছনে কোনও সংগঠিত পরিকল্পনা ছিল—সেটিও তদন্তের বিষয়। আপাতত হালিশহরের ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ার আশঙ্কাই দেখা দিয়েছে।



