আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)। বিশ্বকাপকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং দর্শকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও টি20 বিশ্বকাপ—দুই টুর্নামেন্টের ফরম্যাটেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের পুরুষদের টি20 বিশ্বকাপের আগে অ্যাসোসিয়েট দেশগুলির জন্য নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চালুরও পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে আইসিসি।
স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় অনুষ্ঠিত আইসিসি বোর্ডের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বোর্ডের মতে, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে প্রতিযোগিতার প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব বাড়বে এবং অপেক্ষাকৃত ছোট ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলিও নিজেদের মেলে ধরার আরও বেশি সুযোগ পাবে।
কেন বদল আনছে ICC?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিযোগিতার মান বাড়ানো এবং বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য। আইসিসির মতে, নতুন ফরম্যাটে টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচের ফলাফল পরবর্তী পর্যায়ে প্রভাব ফেলবে, ফলে দলগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হবে।
এর পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েট সদস্য দেশগুলিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওয়ানডে বিশ্বকাপে কী পরিবর্তন আসছে?
নতুন নিয়ম অনুযায়ী ১৪টি দলই ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশ নেবে। তবে নকআউট পর্বে পৌঁছানোর আগে টুর্নামেন্টটি একাধিক ধাপে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রথম ধাপ: সুপার সিরিজ
র্যাঙ্কিংয়ের নিচের তিনটি দল (১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর) প্রথমে নিজেদের মধ্যে রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে একটি ‘সুপার সিরিজ’ খেলবে। প্রত্যেক দল একে অপরের বিরুদ্ধে একটি করে ম্যাচ খেলবে।
এই সিরিজের সেরা দল মূল প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় ধাপে যোগ দেবে।
দ্বিতীয় ধাপ: দুটি গ্রুপ
এই পর্যায়ে মোট ১২টি দল থাকবে। দলগুলিকে ৬টি করে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হবে এবং প্রতিটি গ্রুপে সব দল একে অপরের বিরুদ্ধে একটি করে ম্যাচ খেলবে।
প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ তিনটি দল এবং দুই গ্রুপ মিলিয়ে পরবর্তী সেরা একটি দল যোগ্যতা অর্জন করবে ‘সুপার ৭’ পর্বের জন্য।
সুপার ৭ ও সেমিফাইনাল
সুপার ৭-এ সাতটি দল আবার একে অপরের বিরুদ্ধে খেলবে।
এই পর্বের শেষে শীর্ষ চারটি দল সেমিফাইনালে উঠবে। এরপর প্রচলিত নকআউট পদ্ধতিতে সেমিফাইনাল ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।
আইসিসির দাবি, এই ব্যবস্থায় বিশ্বকাপের শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে এবং তুলনামূলকভাবে ছোট দলগুলিও আরও বেশি সুযোগ পাবে।
টি20 বিশ্বকাপেও আসছে নতুন ফরম্যাট
টি20 বিশ্বকাপেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আগে গ্রুপ পর্বে ৫টি করে ৪টি গ্রুপ থাকলেও এবার হবে ৪টি করে ৫টি গ্রুপ।
প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল পরবর্তী রাউন্ডে উঠবে। নতুন এই পর্বের নাম রাখা হয়েছে ‘সুপার ১০’।
সুপার ১০ কীভাবে হবে?
মোট ১০টি দলকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হবে।
- দুই গ্রুপের শীর্ষ দল সরাসরি সেমিফাইনালে উঠবে।
- প্রতিটি গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী দল অন্য গ্রুপের তৃতীয় স্থানে থাকা দলের বিরুদ্ধে এলিমিনেটর ম্যাচ খেলবে।
- এলিমিনেটরে জয়ী দুটি দল শেষ চারে জায়গা করে নেবে।
এই কাঠামোর ফলে নকআউটে ওঠার লড়াই আরও কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে মনে করছে আইসিসি।
২০২৮ টি20 বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের পথেও বদল
বিশ্বকাপের মূল ফরম্যাটের পাশাপাশি বাছাই প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী—
- ২০২৬ সালের টি20 বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুবাদে স্কটল্যান্ড সরাসরি ইউরোপ রিজিওনাল ফাইনালে খেলবে।
- যে দলগুলি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেললেও ২০২৮ সালের জন্য সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে না, তারা গ্লোবাল কোয়ালিফায়ারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
রিজিওনভিত্তিক বণ্টন অনুযায়ী—
- আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপ থেকে ২টি করে দল,
- আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ১টি করে দল গ্লোবাল কোয়ালিফায়ারে সুযোগ পাবে।
অ্যাসোসিয়েট দেশগুলির জন্য নতুন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট
আইসিসি ২০২৮ সালের পুরুষদের টি20 বিশ্বকাপের আগে অ্যাসোসিয়েট সদস্য দেশগুলির জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চালুর সিদ্ধান্তও নিয়েছে।
এর ফলে পূর্ণ সদস্য নয় এমন দেশগুলির আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়বে এবং বিশ্বকাপের আগে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবর্তন?
নতুন ফরম্যাট কার্যকর হলে বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব বাড়বে। একই সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ছোট দলগুলিও বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার আরও বেশি সুযোগ পাবে।
দর্শকদের জন্যও প্রতিযোগিতা আরও আকর্ষণীয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ নকআউটে ওঠার সমীকরণ আগের তুলনায় আরও কঠিন এবং উত্তেজনাপূর্ণ হবে।
শেষ কথা
বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতেই এই পরিবর্তনের পথে হাঁটছে আইসিসি। নতুন ফরম্যাট কার্যকর হলে শুধু বড় দল নয়, অ্যাসোসিয়েট দেশগুলিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই নতুন কাঠামো বিশ্বকাপের লড়াইকে এক নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে ক্রিকেট মহলের একাংশের ধারণা।



