রাঁচির রাস্তায় পুলিশের জলকামানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ, স্লোগান আর আন্দোলনকারীদের পাল্টা প্রতিরোধ—ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে বিক্ষোভ ক্রমেই বড় আকার নিচ্ছে। শুধু পরীক্ষার্থীরা নন, আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও নজরে এসেছে।
চতুর্দশ JPSC সিভিল সার্ভিসেস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন একাংশ পরীক্ষার্থী। তাঁদের অভিযোগ, পরীক্ষায় অনিয়ম হয়েছে এবং গোটা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
কী নিয়ে শুরু হল ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলন?
চতুর্দশ JPSC সিভিল সার্ভিসেস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আন্দোলনের সূত্রপাত। পরীক্ষার্থীদের একাংশ ফলাফল এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শুধু JPSC নয়, ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের CGL পরীক্ষার নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, সরকারি নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কোনও ধরনের সন্দেহ বা অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়।
তাঁদের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো
এই বিক্ষোভে অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে তিনি টানা কয়েক দিন অনশন কর্মসূচি পালন করেন।
আন্দোলনের মধ্যে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথোপকথনের কথাও সামনে আসে। এরপর তিনি জল গ্রহণ করে অনশন সাময়িকভাবে শেষ করলেও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি।
এই কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন মহলে তাঁকে ‘ঝাড়খণ্ডের সোনম ওয়াংচুক’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য কী?
আন্দোলনকারীদের দাবির বিপরীতে রাজ্য সরকারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের দাবি, পরীক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবির অধিকাংশই বিবেচনা করা হয়েছে।
অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদারকি কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে আন্দোলন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনও আন্দোলনকারীদের বিষয়টি নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন বলে জানা যায়। তবে সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মতপার্থক্য পুরোপুরি কাটেনি।
কোথায় আটকে রয়েছে মূল সমস্যা?
আন্দোলনকারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হল গোটা ঘটনার CBI তদন্ত। একইসঙ্গে পরীক্ষার ফল বা নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবিও তাঁরা তুলছেন।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকার যে তদন্ত ও তদারকি ব্যবস্থার কথা বলছে, সেটিকেই যথেষ্ট মনে করছেন না আন্দোলনকারীদের একাংশ।
ফলে মূল বিরোধ দাঁড়িয়েছে তদন্তের পদ্ধতি এবং পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই জায়গাতেই এখনও কোনও সমঝোতা তৈরি হয়নি।
বিধানসভা ঘেরাও ঘিরে উত্তেজনা
আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে বিধানসভা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি নেয় বিক্ষোভকারীরা। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাঁচিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।
পুলিশ আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে জলকামান ব্যবহার করে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতেও আন্দোলনকারীদের একাংশ অবস্থান থেকে সরে যাননি। বরং জলকামানের সামনে তাঁদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
কেউ কেউ অভিনব সাজেও প্রতিবাদে অংশ নেন। এমনই এক প্রতিবাদীকে স্পাইডার-ম্যানের পোশাকে দেখা যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কেন এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ?
ঝাড়খণ্ডের এই বিক্ষোভকে শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে অসন্তোষ হিসেবে দেখছেন না আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব সরাসরি চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যতের উপর পড়ে।
একজন পরীক্ষার্থীকে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিতে হয়। ফলে পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম বা ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, বহু তরুণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
এই কারণেই আন্দোলনকারীরা তদন্তের ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থা চাইছেন, যার উপর তাঁদের পূর্ণ আস্থা থাকবে।
শুধু ঝাড়খণ্ড নয়, বড় প্রশ্ন নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারি চাকরির পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভিযোগে আন্দোলন হয়েছে।
তবে প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা আলাদা করে তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা সম্ভব। তাই কোনও পরীক্ষাকে ঘিরে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
ঝাড়খণ্ডের ক্ষেত্রেও এখন নজর থাকবে তদন্ত প্রক্রিয়া, সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনার দিকে।
মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও কেন থামছে না আন্দোলন?
সরকারের তরফে আশ্বাস এবং তদারকি কমিটির প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি মূলত তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে।
আন্দোলনকারীদের একাংশ CBI তদন্তে অনড়। অন্যদিকে রাজ্য সরকার নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলার পথে এগোতে চাইছে বলে তাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।
ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দুই পক্ষের মধ্যে কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ বের হয় কি না।
সামনে কী হতে পারে?
ঝাড়খণ্ডের এই আন্দোলন আপাতত একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও তাঁদের স্বচ্ছ তদন্তের দাবি, অন্যদিকে সরকারের তদন্ত ও তদারকি ব্যবস্থার প্রস্তাব—দুইয়ের মধ্যে দূরত্ব কমানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার অভিযোগ কীভাবে খতিয়ে দেখা হবে এবং তার ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে এই আন্দোলনের পরবর্তী দিক।
তবে রাঁচির রাস্তায় জলকামানের সামনে দাঁড়িয়ে যে ছবি তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তরুণ সমাজের প্রত্যাশা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র।



