বিশ্ব রাজনীতির অস্থির পরিস্থিতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ—এই তিনকে সামনে রেখেই দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi। সাম্প্রতিক এক জনসভায় তিনি সাধারণ মানুষকে এমন কিছু অভ্যাস বদলের পরামর্শ দিয়েছেন, যা নিয়ে এখন দেশজুড়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। বিশেষ করে সোনা কেনা, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার এবং বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে তাঁর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
তেলঙ্গানার সেকেন্দ্রাবাদে আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, করোনা মহামারির সময় থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি ধাক্কা খেতে শুরু করে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য, জ্বালানি ও সারের দামে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপরও।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারতকে এখনও বিপুল পরিমাণে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল, গ্যাস এবং ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে গণপরিবহন ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সম্ভব হলে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে মেট্রো, বাস বা কারপুল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো উচিত। এতে যেমন জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তেমনই পরিবেশ দূষণও কমবে। পাশাপাশি তিনি ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সংস্কৃতির কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে কাজ করলে যাতায়াত কমবে এবং জ্বালানি খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
শুধু জ্বালানি নয়, রান্নার তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংযমের বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভারত বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। তাই যদি সাধারণ মানুষ সামান্য হলেও তেলের ব্যবহার কমান, তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে তা বড় ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনতার দিক থেকেও কম তেল খাওয়া উপকারী বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়েছে সোনা কেনা নিয়ে তাঁর মন্তব্য ঘিরে। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে আগামী এক বছর অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানিয়েছেন। কারণ, সোনা আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। তাঁর মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সেই অর্থ দেশের অন্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করা বেশি জরুরি।
এছাড়াও রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার কৃষিজমির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই জৈব চাষ এবং বিকল্প পদ্ধতির দিকে কৃষকদের আরও বেশি ঝুঁকতে হবে।
বিদেশ ভ্রমণ নিয়েও তিনি সংযমের পরামর্শ দিয়েছেন। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর কমালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে মনে করছেন তিনি। যদিও তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের আহ্বান হিসেবে দেখছেন, আবার বিরোধীদের একাংশ বলছে—এটি দেশের অর্থনৈতিক চাপেরই ইঙ্গিত।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রধানমন্ত্রী যে বিষয়গুলি তুলে ধরেছেন, সেগুলির সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সোনার দাম বৃদ্ধির ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই সাধারণ মানুষের সচেতন ব্যবহার অর্থনীতির উপর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি না করলেও তাঁর বক্তব্যে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। এখন দেখার, দেশবাসী তাঁর এই আহ্বানে কতটা সাড়া দেন এবং তা দেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।



