পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকারের প্রথম দিকের পদক্ষেপ ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল প্রবল কৌতূহল। বিশেষ করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথীর মতো জনপ্রিয় সামাজিক প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েই ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনা। অবশেষে সেই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বড় ঘোষণা করলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দিলেন, রাজ্যে বর্তমানে চালু থাকা কোনও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না। বরং ভবিষ্যতে আরও নতুন প্রকল্প যুক্ত হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
সোমবার নবান্নে নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “এই সরকার শুধুমাত্র কোনও রাজনৈতিক দলের সরকার নয়। এই সরকার বাংলার মানুষের সরকার। তাই মানুষের স্বার্থে চালু থাকা কোনও প্রকল্প বন্ধ করা হবে না।” তাঁর এই মন্তব্য সামনে আসতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন বহু সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলি।
নতুন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্পের সুবিধাও এবার দ্রুত রাজ্যের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কেন্দ্রীয় প্রকল্প সংক্রান্ত সমস্ত আবেদন দ্রুত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকে পাঠানো হয়। তাঁর দাবি, “ডবল ইঞ্জিন সরকার” থাকায় এবার উন্নয়নের গতি আরও বাড়বে এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়ে বাংলায় নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের রাস্তা খুলবে।
শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, আগের সরকারের আমলে বহু প্রকল্প শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ ছিল। কিন্তু তাঁর সরকার “দল নয়, মানুষ”-এর নীতিতে বিশ্বাসী। তাই ভবিষ্যতে কোনও প্রকল্পে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনই হবে মূল মাপকাঠি।
এদিনের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মোট ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও সেই সব সিদ্ধান্তের বিস্তারিত এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, তবে প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাজ্যের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বড় কিছু ঘোষণা আসতে পারে।
সবথেকে বেশি চর্চায় উঠে এসেছে ডিএ এবং সপ্তম বেতন কমিশন প্রসঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সোমবার ফের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ বৃদ্ধি এবং সপ্তম বেতন কমিশন নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের সরকারি কর্মচারীরা ডিএ ইস্যুতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে শুভেন্দুর এই মন্তব্যে নতুন করে আশার আলো দেখছেন রাজ্য সরকারি কর্মীরা।
শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্প যেমন প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা, প্রধানমন্ত্রী কৃষক বিমা যোজনা, উজ্জ্বলা যোজনা, বিশ্বকর্মা প্রকল্প, পিএম শ্রী এবং বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও-এর মতো প্রকল্প দ্রুত বাংলায় কার্যকর করার ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বাংলার মানুষ এতদিন অনেক কেন্দ্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এবার সেই পরিস্থিতি বদলাবে।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, নারী নিরাপত্তা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কড়া অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। আরজি কর-কাণ্ড, নারী নির্যাতন এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ে আগামী দিনে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, “মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। তাই স্বচ্ছ প্রশাসন এবং দ্রুত পরিষেবা দেওয়াই এখন সরকারের প্রথম লক্ষ্য।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারীর এই বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন সরকার গঠনের পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, আগের সরকারের জনপ্রিয় প্রকল্পগুলি হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই আশঙ্কা দূর করে তিনি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করলেন, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালুর আশ্বাস দিয়ে উন্নয়নের নতুন রূপরেখাও তুলে ধরলেন।
এখন দেখার, আগামী সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ডিএ, সপ্তম বেতন কমিশন এবং নতুন প্রকল্প নিয়ে ঠিক কী কী ঘোষণা আসে। কারণ সেই সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলা।



