পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলির শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে এবার বড় উদ্যোগ নেওয়া হল। কেন্দ্র সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রকল্প ‘বিদ্যাঞ্জলি’ এবার বাংলাতেও কার্যকর হতে চলেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং সফল মানুষদের সরাসরি সরকারি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ফলে এবার শুধুমাত্র সরকারি শিক্ষক নিয়োগের উপর নির্ভর না করে, সাধারণ মানুষও স্কুল শিক্ষার উন্নয়নে অংশ নিতে পারবেন। এই ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষামহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি এবার পরীক্ষা না দিয়েও শিক্ষকতা করা যাবে? কীভাবে কাজ করবে এই প্রকল্প? আর এতে যোগ দেওয়ার নিয়মই বা কী?
কী এই ‘বিদ্যাঞ্জলি’ প্রকল্প?
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘শিক্ষক পর্ব’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi ‘বিদ্যাঞ্জলি ২.০’ পোর্টালের সূচনা করেছিলেন। এটি মূলত একটি School Volunteer Management Program, যার উদ্দেশ্য হল দেশের সরকারি স্কুলগুলিকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের সঙ্গে যুক্ত করা।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই পোর্টালের মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, চাকুরিজীবী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, খেলোয়াড়, NRI, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিংবা বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলিও সরাসরি সরকারি স্কুলের উন্নয়নে অংশ নিতে পারবে।
এখানে মূল জোর দেওয়া হয়েছে ‘স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ’-এর উপর। অর্থাৎ সমাজের অভিজ্ঞ মানুষরা নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা স্কুল পড়ুয়াদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবেন।
কীভাবে উপকৃত হবে সরকারি স্কুল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলার বহু সরকারি স্কুলে এখনও পর্যাপ্ত শিক্ষক, ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা বা আধুনিক পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই সমস্যা আরও বেশি।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প কার্যকর হলে ছাত্র-ছাত্রীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তারা বিভিন্ন পেশার সফল মানুষদের কাছ থেকে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, কেরিয়ার গাইডেন্স এবং আধুনিক দক্ষতা শেখার সুযোগ পাবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনও IT পেশাদার যদি সপ্তাহে একদিনও গ্রামের স্কুলে গিয়ে কম্পিউটার শেখান, তাহলে পড়ুয়ারা ডিজিটাল শিক্ষার সঙ্গে দ্রুত পরিচিত হতে পারবে। একইভাবে খেলাধুলা, সংগীত, আঁকা বা বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞদের সাহায্য মিলতে পারে।
শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণাও বাড়বে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। কারণ সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষদের কাছ থেকে সরাসরি শেখার সুযোগ ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
কীভাবে আবেদন করতে হবে?
এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কেন্দ্র সরকারের শিক্ষা মন্ত্রক একটি নির্দিষ্ট Vidyanjali Portal চালু করেছে, যেখানে আগ্রহীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন।
প্রথমে আবেদনকারীকে পোর্টালে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, দক্ষতা এবং কোন বিষয়ে সাহায্য করতে চান, সেই তথ্য দিতে হবে।
তারপর কোন জেলা বা কোন নির্দিষ্ট স্কুলে কাজ করতে ইচ্ছুক, সেটিও বেছে নেওয়া যাবে। পাশাপাশি স্কুলগুলিও নিজেদের প্রয়োজনীয়তা পোর্টালে আপলোড করতে পারবে। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ আবেদন যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী কী?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জেনে রাখা জরুরি—বিদ্যাঞ্জলি কোনও চাকরির প্রকল্প নয়। এটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ। অর্থাৎ এখানে যুক্ত হয়ে কেউ বেতন, সরকারি চাকরি বা ভাতা পাবেন না।
তাই চাকরির নাম করে কোনও প্রতারণা বা আর্থিক জালিয়াতি এড়াতে প্রশাসন বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থাও রাখছে।
এছাড়া স্কুলে বাইরের কেউ পড়াতে এলে তাঁদের পরিচয়পত্র ও ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যাতে ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনওরকম সমস্যা তৈরি না হয়।
বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে?
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প বাংলার সরকারি স্কুলগুলির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলগুলিতে যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক বা আধুনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ কম, সেখানে এই প্রকল্প নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সমাজের সফল ও অভিজ্ঞ মানুষরা যদি নিয়মিতভাবে স্কুল পড়ুয়াদের মেন্টরশিপ দেন, তাহলে শিক্ষার মান অনেকটাই উন্নত হতে পারে। পাশাপাশি পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।
তবে এই প্রকল্প বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে স্কুলগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার উপর। এখন দেখার, বাংলার কতগুলি সরকারি স্কুল দ্রুত এই পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ কতটা আগ্রহ নিয়ে এই উদ্যোগে অংশ নেন।



