বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতে এমন কিছু অভিনেতা রয়েছেন, যাঁদের পর্দার চরিত্র দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কখনও নিষ্ঠুর খলনায়ক, কখনও ভয়ংকর প্রতিপক্ষ—তাঁর অভিনয় বহু ছবির গল্পকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। অন্যদিকে, শতাব্দী রায়ও আশির দশক থেকে বাংলা ছবির পরিচিত মুখ।
১৯৮৭ সালের ‘প্রতিকার’ ছবিতে এই দুই শিল্পীকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল পর্দার এক কঠিন সমীকরণ। সেই সূত্র ধরেই মাঝেমধ্যে প্রশ্ন ওঠে—পর্দায় এমন তীব্র সংঘাতের পর বাস্তব জীবনে কি তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল? নাকি তাঁদের সম্পর্কের আসল গল্পটি ছিল পেশাগত আস্থা ও দীর্ঘদিনের সহকর্মিতার?
‘প্রতিকার’ ছবিতে কী ছিল তাঁদের সমীকরণ?
১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রতিকার’ শতাব্দী রায়ের অভিনয়জীবনের শুরুর দিকের একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার সেই সময়ে নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি খলনায়কের চরিত্রও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠত। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় এমন বহু চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
‘প্রতিকার’-এর মতো ছবিতে পর্দার সংঘাত দর্শকের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারত। তবে সিনেমার চরিত্রের আচরণকে অভিনেতার বাস্তব ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। পর্দায় প্রতিপক্ষের ভূমিকায় অভিনয় করা মানেই বাস্তব জীবনেও দুই শিল্পীর মধ্যে শত্রুতা ছিল, এমন নয়।
বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় ও শতাব্দী রায় কি সত্যিই প্রেমে পড়েছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে গুজব ও যাচাই করা তথ্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় ও শতাব্দী রায়ের মধ্যে বাস্তব জীবনে প্রেমের সম্পর্ক ছিল—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তাঁদের দীর্ঘ পেশাগত পরিচয় অবশ্যই রয়েছে। বিভিন্ন চলচ্চিত্র-তথ্যসূত্রে দু’জনের একাধিক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করার কথা উঠে এসেছে। কিন্তু একসঙ্গে কাজ করা, পরস্পরের অভিনয়ের উপর আস্থা রাখা বা একই পরিচালকের ছবিতে বারবার অভিনয় করা—এসব থেকেই ব্যক্তিগত প্রেমের সম্পর্কের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
তাই তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রমাণিত কর্মজীবনের তথ্যের উপর নির্ভর করাই সঠিক।
কেন নিজের পরিচালিত ছবিতেও শতাব্দী রায়কে নিয়েছিলেন বিপ্লব?
অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় পরিচালনার কাজেও যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘অভিমন্যু’ (১৯৯০), ‘প্রজাপতি’ (১৯৯৩), ‘বিদ্রোহিণী’ (১৯৯৪) এবং ‘চোর ও ভগবান’ (২০০৩)। এই ছবিগুলির সঙ্গে শতাব্দী রায়ের নামও যুক্ত রয়েছে।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, বিভিন্ন সময়ে তাঁদের পেশাগত সহযোগিতা অব্যাহত ছিল। পরিচালকের কাছে কোনও অভিনেতার অভিনয়ক্ষমতা, চরিত্রের সঙ্গে মানানসই হওয়া এবং কাজের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। তবে শতাব্দীকে বারবার বেছে নেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিপ্লবের কোনও প্রত্যক্ষ বক্তব্য না থাকলে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পর্দার খলনায়ক আর বাস্তবের মানুষ কি এক?
বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের অন্যতম পরিচয় তাঁর খলনায়ক চরিত্রগুলি। কিন্তু কোনও অভিনেতার পর্দার ভূমিকা দিয়ে তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব বিচার করা যায় না। একইভাবে, ছবিতে দুই শিল্পীর চরিত্রের মধ্যে সংঘাত থাকলেও বাস্তবে তাঁদের সম্পর্ক যে খারাপ ছিল, এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না।
দীর্ঘদিনের বাংলা চলচ্চিত্রজগতে সহ-অভিনেতাদের মধ্যে পেশাগত বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক আস্থা অনেক সময় বারবার একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় ও শতাব্দী রায়ের ক্ষেত্রেও তাঁদের একাধিক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করার তথ্য সেই পেশাগত যোগসূত্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
প্রেমের গুঞ্জন নয়, তাঁদের কাজই আসল পরিচয়
বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় ও শতাব্দী রায়কে ঘিরে প্রেমের জল্পনা তৈরি হতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া সেই জল্পনাকে সত্যি বলে প্রচার করা উচিত নয়। তাঁদের কর্মজীবনের দিকে তাকালে বরং দেখা যায়, বাংলা সিনেমার একাধিক ছবিতে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন এবং বিপ্লবের পরিচালিত ছবিতেও শতাব্দী অভিনয় করেছেন।
পর্দায় তাঁদের চরিত্রের সংঘাত, অভিনয়ের বৈচিত্র্য এবং দীর্ঘ পেশাগত যোগাযোগই এই দুই শিল্পীর সম্পর্কের আলোচনায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দিক। বাস্তব জীবনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য না থাকলে, তাঁদের কাজ ও অবদানকে কেন্দ্র করেই গল্পটি বলা উচিত।



