ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খের ধ্বনি আর মহিলাদের সমবেত উলুধ্বনি—এই তিনের মেলবন্ধনেই যেন বাঙালির দুর্গাপুজোর আবহ পূর্ণতা পায়। পুজোর আরতি, সিঁদুরখেলা কিংবা বিসর্জনের মুহূর্তে উলুধ্বনি শোনা গেলেই উৎসবের আনন্দ যেন আরও বেড়ে যায়। শুধু দুর্গাপুজো নয়, বাঙালি বিয়ে এবং নানা শুভ অনুষ্ঠানেও এই বিশেষ ধ্বনির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, উলুধ্বনি আসলে কী? কেনই বা শুভ মুহূর্তে মহিলারা এই ধ্বনি দেন? আর কোথা থেকেই বা এল এই প্রথা?
উলুধ্বনি কী? কীভাবে তৈরি হয় এই বিশেষ শব্দ?
উলুধ্বনি হল জিভ ও মুখের দ্রুত সঞ্চালনের মাধ্যমে তৈরি করা এক ধরনের উচ্চ, কম্পনযুক্ত কণ্ঠধ্বনি। বাংলার লোকাচারে এটি সাধারণত মহিলারা দিয়ে থাকেন। একসঙ্গে অনেকের উলুধ্বনি উৎসবের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
ভারতের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের ধ্বনি দেওয়ার রীতি দেখা যায়। অঞ্চলভেদে এর নাম, উচ্চারণ ও ব্যবহারেও পার্থক্য রয়েছে। বাংলায় এটি পরিচিত ‘উলুধ্বনি’ নামে। বিয়ে ও ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বিভিন্ন আনন্দের মুহূর্তেও এই ধ্বনি দেওয়া হয়।
দুর্গাপুজোয় উলুধ্বনি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাঙালির দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবেগেরও প্রকাশ। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি এবং উলুধ্বনি মিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবের পরিচিত পরিবেশ।
পুজোর সময় আরতি, দেবীকে বরণ এবং বিসর্জনের মতো নানা মুহূর্তে উলুধ্বনি দেওয়া হয়। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর সিঁদুরখেলায় মহিলাদের সমবেত উলুধ্বনি উৎসবের আনন্দ ও আবেগকে আরও গভীর করে তোলে।
এই ধ্বনি অনেকের কাছে দেবীর প্রতি ভক্তি, শুভকামনা এবং আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলার দুর্গোৎসবের সঙ্গে উলুধ্বনির সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
বিয়েতে উলুধ্বনি দেওয়ার কারণ কী?
বাঙালি বিয়েতে উলুধ্বনি একটি পরিচিত লোকাচার। বরকে বরণ করা, কনেকে স্বাগত জানানো কিংবা বিয়ের বিশেষ মুহূর্তে এই ধ্বনি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশের পাশাপাশি নবদম্পতির জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য শুভকামনাও জানানো হয়।
এখানে উলুধ্বনির গুরুত্ব মূলত সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন একসঙ্গে এই ধ্বনি দিলে অনুষ্ঠান আরও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। তবে বিয়ের প্রতিটি রীতির মতো উলুধ্বনি দেওয়ার ধরনও পরিবার ও অঞ্চল অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।
উলুধ্বনির উৎপত্তি কোথা থেকে?
উলুধ্বনির উৎপত্তি ঠিক কোন সময়ে, কোথায় বা কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য সহজলভ্য নয়। তাই এর নির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল বা একক সূচনাকাল দাবি করা ঠিক হবে না।
তবে এটি যে বাংলার দীর্ঘদিনের লোকাচার ও ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ, তা বর্তমান প্রচলন থেকেই বোঝা যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে শুভ অনুষ্ঠান ও আনন্দের মুহূর্তে একই ধরনের ধ্বনি দেওয়ার রীতি থাকায় এর সাংস্কৃতিক পরিসরও বৃহত্তর।
সময়ের সঙ্গে উৎসবের ধরন বদলালেও উলুধ্বনি আজও বাঙালির ঐতিহ্যের পরিচিত অংশ হিসেবে টিকে রয়েছে।
উলুধ্বনি কি সত্যিই অশুভ শক্তি দূর করে?
লোকবিশ্বাসে উলুধ্বনিকে শুভ শক্তির আহ্বান, মঙ্গলকামনা এবং অশুভ দূর করার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও শুভ কাজের সময় এই ধ্বনি দেওয়ার পিছনে সেই বিশ্বাসের প্রভাব রয়েছে।
তবে অশুভ শক্তি দূর করার ক্ষমতা উলুধ্বনির রয়েছে—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস হিসেবে বোঝাই যথাযথ।
উলুধ্বনি শুধু শব্দ নয়, বাঙালির আবেগও
দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ঢাকের তালে উলুধ্বনি, বিয়েবাড়িতে নবদম্পতিকে স্বাগত জানানো কিংবা বিজয়া দশমীতে দেবীকে বিদায়ের মুহূর্ত—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই ধ্বনি আলাদা আবেগ বহন করে।
উলুধ্বনির বিশেষত্ব এখানেই। এটি একদিকে শুভ মুহূর্তের আনন্দ প্রকাশ করে, অন্যদিকে পরিবার, সমাজ ও প্রজন্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই আধুনিক উৎসবের আয়োজনেও উলুধ্বনি বাঙালির পরিচিত আবহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



